Skip to main content

Full text of "Jaig Stifun Setubandh"

See other formats


ES Bt ef * fe fe AAS 


রি 


NAS 2 AAANNANANNANANN 


পার বস 
লা! চিল) সই 


a ড 


RR bins + SU 5 
OT oY 


Stefan-Zweig- 4g FEAR-র অক্বাদ 


১৪বি শঙ্কর ঘোয লেন 
কলকাতা-৬ sAGHY 


প্রচ্ছদ ৬০ 

An 
নিউ প্রাইম প্রেস 6 
কলকাতা 

পরিবেশক 

ক্যালকাট| বুক এজেন্সী 

৭ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট 

কলকাতা-৬ 


দু’ টাকা 


So MELE 


শিল্পী মনীন্দর মিত্র 


শাত্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য বই 


! প্ৰবন্ধ । 
আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য 
! গল্প। 
নতুন নায়িক৷ 
রাম রহিম 
রাত্রির আকাশে সূর্য্য 
৷ অক্ুবাদ । 
প্রিয়তমেষু 
সেই আশ্চৰ্য রাত 
দুই-ভাই 


অন্ত লো 


প্রেমিকের ফ্ল্যাট থেকে সিড়ি দিয়ে নেমে এল আইরিন 
প্রতিবারের মত আজও দুর্বোধ্য একটা আতঙ্কে সে দিশেহারা 
হয়ে পড়েছে। ভালে! করে চোখ মেলে চাইতে পারছে না। 
হাটু দুটো যেন ভেঙে আসছে-_রেলিড ধরে কোনমতে পড়তে, 
পড়তে সে সামলে নিল । 

কত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত আইরিন এই আতঙ্কের সঙ্গে ! 
প্রায়-প্রত্যেকবার প্রেমিকের কাছ থেকে ফিরে যাবার সময় 
আতঙ্কট! তাকে ছেঁকে ধরে, অভিভূত করে ফেলে। অথচ, 
একেবারে যুক্তিহীন এই আতঙ্ক, একেবারেই অহেতুক ! 

অহেতুক, তবু মনে হয় বিপদের তার অবধি নেই। এই 
বুঝি ঘটে যায় ভয়ঙ্কর কিছু-একট!। প্রিয়মিলনের পর এ-ধরনের 
আতঙ্ক জাগা হাস্যকর বইকি ! আইরিনও তা বোঝে। এবং 
আগে থেকেই নার্ডান' হয়ে পড়লে, তার একট! মানে হয় ॥ 
কিন্তু কই--ত! তে! হয়নি! p 

ট্যাক্সিতে করে এসেছিল। রাস্তার মোড়ে ট্যাক্সি ছেড়ে 
দিয়েছিল । তারপর, কোনদিকে না তাকিয়ে তাড়াতাড়ি পা 
চালিয়ে এসে ঢুকেছিল প্রেমিকের ফ্ল্যাটে । পেয়েছিল নিশ্চিন্ত 
আশ্রয় । আসবার সময় যেটুকু উৎকণঠা মনে জেগেছিল, 
প্রিয়তমের সাহচর্যে কখন তা মুছে গিয়েছে। কেটে গিয়েছে 
ঘণ্টার পর ঘণ্টা, টেরও পায়নি! অক্ষয় সেই মদির মুহুর্তগুলি ! 


সেতুবন্ধ 

কিন্তু, বাড়ি ফিরে যাবার সময় হতেই-_৩ঃ ভগবান! বাড়ি 
ফেরার কথা মনে হতেই দুর্বোধ্য একটা আতঙ্ক মাথা চাড়া দিয়ে 
ওঠে। মন ছেয়ে যায় অপরাধবোধে । আইরিন দিশেহারা হয়ে 
পড়ে। মনে হয়, দূর-প্রসারিত পথটি যেন নির্বাক জিজ্ঞাসায় 
চেয়ে রয়েছে তার দিকে। যেন জানতে চাইছে, কি হয়েছে 
আইরিনের ?' কেন মুখখানি তার অমনভাবে ফ্যাকাশে হয়ে 
গিয়েছে? 

প্রেমিকের সঙ্গে শেষ সময়টুকু ভালোভাবে সে কাটাতে 
পারে না। মন খুলে কথা কইতে পারে না, জবাব দিতে পারে 
না কথার। কেবলি মনে হয়-_আসছে, বিদায়ের চরম মুহুর্ত 
ক্রমেই এগিয়ে আসছে! অসশ্বত্তিতে কেবলি ছটফট করে। 

যখন বিদায় নেয়, থরথর করে কাঁপতে থাকে দেহমন ৷ 
ভালোয় ভালোয় এখান থেকে চলে যেতে পারলে বাঁচে এখন, 
অধৈর্য হয়ে পড়ে যাবার জন্যে। বিদায়বেলায় ও কি বলে, 
কোনদিন আইরিন শোনে না। ওর আদর-সোহাগে সাড়া 
দিতে পারে ন!। কতক্ষণে সে মুক্তি পাবে এই ফ্ল্যাট থেকে! 
কতক্ষণে ফিরে যেতে পারবে নিজের নিরাপদ গৃহকোণে, আপন 
সংসারে--ফিরে পাবে তার অতিপরিচিত পরিবেশ, মধ্যবিত্ত 
জীবনের মান-মর্ধাদা ! কতক্ষণে! 

আইরিনকে ও প্রবোধ দেয়, মিষ্টিমধুর নানা কথা বলে 
ওর কোন কথাই কিন্তু কানে আইরিনের যায় না। বুক তখন 
তার দুরদুর করছে, ফেটে পড়তে চাইছে চাপ! উত্তেজনায় । 


১০ 


সেতুবন্ধ 

তার তখন গুধু এক দুশ্চিন্তা--গাড়িতে ওঠার সময় যদি কেউ 
দেখে ফেলে! তাহলে? বাইরে কেউ আড়ি পেতে নেই তো? 
সিড়ি দিয়ে কেউ কি উঠল, ব! নেমে গেল? প্রেমিকের ঘরের 
ভেতরেও, প্রেমিকের বুকে মাথা রেখেও, আশঙ্কায় আইরিন 
উৎকর্ণ হয়ে ওঠে। 

ঘরের বাইরেই যেন ওৎ পেতে থাকে আতঙ্ক । আইরিন 
বেরোবার সাথে সাথে সে তার পিছু নেয়। আইরিন হলঘরে 
আসতে আসতে সে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। দম বন্ধ 
হয়ে আসে আইরিনের। ধড়াস ধড়াস করে বুকখানি। 

ঘর থেকে বেরিয়ে আইরিন আজ বারেক দাড়াল । অন্ধকার 
সিঁড়ির নিচে থেকে উঠে আসছে মৃতুমন্থর ঠাণ্ডা! হাওয়া, বুক 
ভরে শ্বাস টেনে নিল। 

ক্যাচ করে একট! শব্দ হল দরজা খোলার । শব্দটা শোন! 
মাত্র, নিজের অঙ্জান্তেই, তাড়াতাড়ি টুপিটা সে কপাল পর্যন্ত 
হেলিয়ে দিল, টেনে নামিয়ে দিল ওড়নাটি। তারপর পা বাড়াল 
যাবার জন্যে । জলে যেন আইরিন ঝাপ দিতে যাচ্ছে, দাতে দাত 
চেপে আধ-খোলা দরজার দিকে ঝড়ের বেগে এগিয়ে গেল । 

সদর দরজ| পেরোবে, আচমক। ধাক্কা লেগে গেল একটি 
স্ত্রীলোকের সঙ্গে । “‘আহা-হ!! কিছু মনে করবেন ন!’ 
থতমত খেয়ে কোনমতে কথাগুলি উচ্চারণ করেই আইরিন সরে 
পড়ছিল, কিন্তু স্্ীলোকটি ততক্ষণে দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে পথ 
রোধ করে'দাড়িয়েছে। 


১১ 


সেতুবন্ধ 
বিদ্রপতিক্ত কর্কশ স্বরে সে বলে উঠল, ‘এইবার ঠাকরুন ! 
আজ একেবারে হাতেনাতে পাকড়াও করিছি ! ঠিক ধরেছিনু ! 
নিজের মোয়ামি-সন্সার নিয়ে সুখ হয় না, কেমন? তাই 
আমার মত গরীবগুর্বে! মেয়েছেলের নোক নে টানাটানি } চুরি 
করে নুকিয়ে নুকিয়ে---” 

‘আ-আ-আপনি ভুল করছেন।' বলতে বলতে আইরিন 
পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু উপায় নেই যাবার, 
বোতলের মুখে ছিপির মত শ্ত্রীলোকটি তার বিশাল শরীর দিয়ে 
আগলে রয়েছে দরজ৷ ৷ D 

নি! গো ঠাকরুন-ভুল করছেন না!’ সে মুখ ভেংচে 
উঠল। ‘তোমায় আমি খু-ব চিনি। তোমায় চিনতে আমার 
বাকি নেই। এই মাত্র এডও্য়ার্ডের ঘর থেকে 'হমি বেইরে 
আসছ। জানো, ও আমার গীরিতের মান্ুম ? আর তুমি কিনা 
ভুইলে-ভাইলে.-এইবার তোমায় হাতেনাতে ধরে ফেলিছি।--- 
তাই তে ভাবি, ইদানি ও আর আমার সাথে বেশি কেন রইতে 
চায় ন|। আসলে ভিতরে ভিতরে এই ব্যাপার'--হতচ্ছাড়ি--- 

‘দোহাই আপনার !! বাধা দিল আইরিন। জড়ানো স্বরে 
বলল, ‘দোহাই আপনার, অমন করে চেঁচাবেন ন!!! বলে ছু’'প৷ 
পিছিয়ে গেল হলের দিকে। 

স্ত্রীলোকটি তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে তীত্র চোখে। 
আইরিনের ভয়বিহবল চোখ-মুখ দেখে যেন যো পেয়ে গিয়েছে 


১২ 


সেতুবন্ধ 
সুযোগ: AE SG “ক্কাদে-পড়া শিকারের 


দিকে তাকিয়ে আত্মমন্তির ছাপ ফুটে উঠেছে ওর- চোখে; তিক্ত 


হাসিতে কুঁচকে এসেছে ঠোঁট ছুটি । 

গলা ঝেড়ে নিয়ে এবার সে আরও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে 
লাগল, ‘দেখে তো মনে হয় ভদ্দরবরের বউ ! আর তলে তলে 
কিনা এই ! পরের নোক ভাগিয়ে নেয়া! আবার ঘোমটার 
বাহার কত! ঘোমটা দিলে তে| কেউ চিনতে পারবে না 
নিশ্চিন্ডি! ইদিকে পরপুরুষের সাথে গীরিতও হবে, উদ্িকে 
ঘরসন্সারও বজায় রইবে। মানষের কাছে সতীগিরিও 
ফলানো_’ 

‘কি চান আপনি ?' ফের বাধা দিল আইরিন, ‘আপনার 
সাথে আলাপের সৌভাগ্য আমার কখনো হয়নি। দয়া করে 
এখন পথ ছাড়,ন, আমি যাব!’ 

খযাব{ হুম! তা এখন যেতে হবে বইকি, বড়নোক 
ভাতারের কাছে ফিরে না গেলে চলবে কেন বাছ! ! যাবে- 
নির্যস যাবে! নিজের ঘরসন্সারে ফিরে যাবে, গিয়ে গরম 
জলে চানধূতি করবে, ঝি এসে সাজগোজ কইরে দেবে-তা'পর 
সেজেগুজে পটের পরীটি হয়ে বড়নোক বন্ধুদের পথ চেয়ে বসে 
রইবে। ওরা এলে পর খাতির করে বসাবে, কত যত্বআত্তি.-- 
আমার মত একটা মানুষ না খেয়ে খেয়ে মরে গেলে তোমার 
কিসস্থু আদে যায় ন|!--'আমার শেষ সম্বলটুকুন চুরি করতে:-- 
আমার মনের মানুষটাকে---” 


১৩ 


সেতুবন্ধ 

ব্যাগের মধ্যে হাত পুরে দিয়ে আইরিন প্রায় সবগুলি নোট 
বার করে আনল একসাথে । 

নোটগুলে! স্ত্রীলোকটির হাতে গু'জে দিয়ে ভাঙা-ভাঙ স্বরে 
বলল, ‘নাও...ধরে|-:-স-ব নাও । এবার আমায় যেতে দাও। 
আর কক্ষনো আমি এখানে আসব না৷. প্রতিজ্ঞা করছি, আর 
কোনদিন যদি’ 

স্ত্রীলোকটি নোটগুলি নিল । আক্ৰোশে সে দাত কিড়মিড় 
করছে। 

হা-রা-ম-জাদী!’ শুধু এই কথাটি বলে আইরিনকে পথ 
করে দিল যাবার। 

কথাট! আইরিন শুনেও শুনল না। ঘাড় হেঁট করে 
এগিয়ে চলল, টেনে নিয়ে চলল নিজেকে। এসে পড়ল 
রাস্তায়। কেউ যেন তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে বাড়ির ছাদ 
থেকে। 

ট্যাক্সির জন্যে সে মোড়ের দিকে হনহন করে এগোতে 
লাগল । আবছা-অস্পষ্ট মুখোশের মত মানুষের মুখগুলি 
দেখতে-না-দেখতে মিলিয়ে যাচ্ছে পথের দু'পাশে। শরীরটি 
তার ভারী হয়ে উঠেছে সীসার মত। 

ট্যাক্সতে উঠতেই দেহটা যেন গুড়ে গুঁড়ো হয়ে ভেঙে 
পড়ল-স্প্রিংয়ের গদীর মধ্যে নিজেকে সে ডুবিয়ে দিল। 
মনটা একেবারে শূন্য হয়ে গিয়েছে, শুকিয়ে এসেছে ঠোট 
ছুটি ৷ 


মেতুবন্ক 


কোথায় যেতে হবে তার নির্দেশ ন! পেয়ে ড্রাইভার অবাক! 
EAD 5G aidth gd করল, ‘কোথাও 

যাৰ, ম্যাডাম ?' 

খৃগ্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল আইরিন! মুহূর্তের জন্তে 
ভারপর প্রাণপণ চেষ্টায় শুধু বলল, ‘ইন্টিশান !' 

হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় স্ত্রীলোকটির কথ! । যদি ও পিছু 
নিয়ে থাকে ! যদি ট্যাক্সি পর্যন্ত ধাওয়া! করে থাকে! 

‘জলদি! জলদি করে| ড্রাইভার। যত জোরে পারে৷ 
চালাও।’ আতঙ্কে আইরিন অধৈর্য হয়ে উঠল । 

গাড়িতে যেতে যেতে মন তার খানিকটা! থিতিয়ে আসে। 
এখন বুঝছে, স্ত্রীলোকটির সাথে দেখ! হয়ে যাওয়াতে ভেতরে 
ভেতরে কতখানি সে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। মুণ্ডিবদ্ধ ছুই 
করতল, বরফের মত ঠাণ্ড!। এর অধিকারিণী যেন সে নয়, জড় 
দুটি পদার্থ যেন লেগে রয়েছে তার কবজির সঙ্গে । 

হঠাৎ শিরদাড়ার মধ্যে দিয়ে হিমশীতল একটা শিরশিরানি 
ঝিলিক দিয়ে যায়, থরথরিয়ে ওঠে সর্বাঙ্গ । দম বন্ধ হয়ে 
আসছে, গলায় যেন কি-একট! আটকে গিয়েছে। আঠার মত 
জড়িয়ে আসছে জিব, তেতো-তেতো লাগছে। ভুরু ছুটি কাপছে 
ভয়ানকভাবে। বড় অসুস্থ বোধ করে আইরিন। 

ইচ্ছে করছে, গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে, কিব, 
প্রাণপণে ঘুষি ছু'ড়তে থাকে এলোপাথারি । তবে যদি উদ্ধার 
মেলে ভয়াল-ভয়ঙ্কর ওই স্মৃতির কবল থেকে। 


১৫ 


সেতুবন্ধ 
কিন্তু, অসম্ভব ! অসম্ভব ওর হাঁত থেকে মুক্তি । বঁড়শির 
মত ওই স্থৃতিটা যেন আঁকড়ে ধরেছে মস্তিদ্ধকে। ওঃ! ওই 
কুৎসিৎ মুখখানার কথা ভাবলে এখনো গা রী রী করে ওঠে। কী 
স্থূল! কী কদর্য! মুখ থেকে ভক ভক করে পেঁয়াজ-রস্ুুনের 
গন্ধ বেরুচ্ছে। আর, কী অশ্লীল কথাবার্তা ! কী কর্কশ ক্র ! 
নিচু শ্রেণীর নগণ্য একটা মেয়েমানুষ--অশিক্ষিত অমার্জিত 
ছোটলোক এক স্রীলোক--কিনা ভয় দেখাল তাকে! যা-নয়-তাই 
বলে গালাগাল দিল! 

গ! বমি-বমি করছে। বড় অসহায় বলে মনে হচ্ছে 
নিজেকে। শরীর এলিয়ে বসে রইল আইরিন। ড্রাইভার 
এ্যাক্সিলেটরে চাপ দিচ্ছে, ক্রমেই স্পীড বাড়ছে, গাড়িখান! 
দুলছে--সেই সঙ্গে দুলছে আইরিনের শরীর । দুলছে অসহায়ের 
মত। 
একবার আইরিন ভাবল, ড্রাইভারকে বল আরেকটু আস্তে 
চালাতে ৷--হঠাৎ মনে পড়ে গেল নগদ যা-কিছু ছিল সবই 
তে দিয়ে দিয়েছে ওই ব্ল্যাকমেলারকে ৷ সর্বনাশ ! ট্যাক্সির ভাড়া 
দেবে কোথেকে ? তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে দেখল । দেখে 
স্বপ্তির নিশ্বাস ফেলল-_যাক! ভাড়াটা কুলিয়ে যাবে কোনমতে। 

কিন্তু, স্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার মত সঙ্গতি নেই। ডাঁইভারকে 
গাড়ি থামাতে বলল। গাড়ি থামার সাথে সাথে সে নেমে 
পড়ল, নেমে চুকিয়ে দিল গাড়ির ভাড়া। ব্যাপারস্যাপার 
দেখে ডাইভার তাজ্জব । 


১৬ 


সেতুবন্ধ 


‘ হেঁটেই তাকে বাড়ি যেতে হবে, উপায় নেই। 

এ-জায়গাটা তার অপরিচিত। দপাশের দোকানগুলি অতি 
বাজে ধরনের। পথচারীরাও ঠিক ভদ্রশ্রেণীর নয়, কথাবাতী 
গুনেই সেট| বোঝ! যাচ্ছে। এ-রাস্ত! দিয়ে হাটতে হাটতে 
আইরিন অকথ্য অস্বস্তি বোধ করে। আতঙ্কের জের এখনো 
মেটেনি। এখনে! হাঁটু দুটো ঠক ঠক করছে। বারবার ভেঙে 
পড়তে চাইছে। হেঁটে যাওয়া দুন্কর হয়ে উঠছে। তবু-__তবু 
তাকে যেতেই হবে। যে-করে হোক নিজের বাড়িতে গিয়ে 
পৌছতেই হবে। 

জোর করে আইরিন সোজা করে রাখে নিজেকে। আস্তে 
আস্তে হেঁটে চলে,কোনমতে নিজের দেহটাকে টেনেহি'চড়ে নিয়ে 
চলে। যেন বরফের ওপর দিয়ে পথ করে করে চলেছে সে। 

এরাস্তা ও-রাস্তা করে শেষ পর্যন্ত আইরিন বাড়িতে এসে 
পৌঁছল । পৌঁছেই হনহন করে ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ খেয়াল 
হল ভালো নয় এই অতি ব্যস্ততা। কেউ সন্দেহ করতে পারে। 

হলঘরে আসতে দাসী এসে তার গায়ের কোট খুলে নিয়ে 
গেল । ওপর থেকে ভেসে আসছে ছেলের কলক | বোনটির 
সাথে খেলা করছে। এই তার আপনার ঘর, এই তার আপন 
সংসার! কত পরিচিত এই পরিবেশ ! এতক্ষণে আইরিন 
যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । এতক্ষণে সে নিরাপদ, এতক্ষণে 
নিশ্চিন্ত । এবার চোখমুখ থেকে মুছে ফেলতে হবে ভয়ভীতির 
শেষ চিহ্নটুকুও ৷ স্বাভাবিক হয়ে উঠতে হবে এবার। 


১৭ 


সেতুবন্ধ 
ভুরু এবং চোখের ওপর আঙ্ল ঘষে ঘষে আতঙ্কের 
₹ চিহ্নটাকে মুছে ফেলতে চাইল আইরিন। চোখেমুখে ভালো 
মান্ুযির ভাব ফুটিয়ে তুলে ঢুকল এসে খাবার ঘরে। 

সন্ধ্যাহারের সময় হয়ে গিয়েছে। স্বামী বসে রয়েছেন। 
একমনে কাগজ পড়ছেন। 

‘ঈশ ! তুমি আজ বড্ড দেরি করে ফেলেছ!’ কোমল স্বরে 
তিরস্কার করলেন স্বামী। তারপর উঠে দাড়িয়ে স্ত্রীর কপোলে 
একে দিলেন স্রেহচুম্বন। 

স্বামীর ব্যবহারে ফের আইরিনের মনে অপরাধবোধ জেগে 
ওঠে। সেটাকে গোপন করা অসম্ভব হয়ে দীড়ায়। তাড়াতাড়ি 
সে একট! চেয়ার টেনে বসে পড়ল। স্বামীও বসলেন তার 
চেয়ারে । বসে ফের কাগজে মনোনিবেশ করলেন। মুখখানা 
তার আড়াল পড়ে গেল। 

‘কিনে এত দেরি হল ?' স্বামী জিজ্ঞেস করলেন, নিরাসক্ত 
ভাবে। 

‘আমি.--গল্প.--মানে এমিলির সাথে গল্প করতে করতে:-- 
মানে-‘-ওর আবার কেনাকাটার দরকার ছিল কিনা---তাই ওর 

॥ একি আহাম্মকের মত মিছে কথাগুলি বলছি আমি 
আইরিন ক্ষেপে যায় নিজের ওপর ৷--বুদ্ধি করে আগে থেকে 
একটা-কিছু তেবে রাখতে পারিনি? এমন জলজ্যান্ত নিছে 
কথা কি বিশ্বাস করতে পারে মানুবে 


১৮ 


সেতুবন্ধ 

অন্তান্ত দিন সে আগে থেকেই একট! যুক্তিসহ অজুহাত 
তৈরি করে রাখে। কিন্তু আজ হয়ে গিয়েছে মারাত্মক ভুল 
আতঙ্কে এত-বেশি অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে এদিকের 
কথাটা ভাবতেও পারেনি ।---ধরো, উনি যদি এখন'-- 

হ্হ্যাগা মণি, কী হয়েছে তোমার বলো তে|?' স্বামী 
জিঙ্ডেস করলেন, ‘কেমন মুষড়ে পড়েছ মনে হচ্ছে'--ওৰকি 
ওকি--টুপিটাকেই খাবে নাকি? 

খাবার কাঁটা দিয়ে আনমনে আইরিন টুপিটাকেই খুচিয়ে 
চলেছিল। তাড়াতাড়ি হুশিয়ার হয়ে উঠল । ফের ধর! পড়ে 
গিয়ে ভাবল-_আর এখানে নয়। এক্ষুনি তার নিজের ঘরে 
চলে যাওয়া দরকার । গিয়ে নিজেকে আগে ভদ্রস্থ করে তোলা 
প্রয়োজন । 

নিজের-ঘরে চলে এল আইরিন । বিমুঢ় হয়ে গেল আয়নার 
দিকে তাকিয়ে-ওকি বিভ্রান্ত চাউনি ফুটে উঠেছে তার ছুই 
চোখে! এক্ষুনি নিজেকে সামলে নিতে হবে। ফিরিয়ে 
আনিতে হবে আত্মকতৃত। 

মিনিট কয়েকের মধ্যেই ANCES CuFt 
স্বামীর কাছে। ৰ 

' দাসী খাবার পরিবেশন করে গেল। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক 

হয়ে আসে সবকিছু । শুরু হয় দৈনন্দিন পুনরাবৃত্তি। এই 
দম্পতির মধ্যে কথাবার্তায় উচ্ছাসের মাত্রা এমনিতেই একটু 
কম। পরস্পরকে নিয়ে সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর মত হৈচৈ এরা 


১৯ 


(a y নেতুব্ধ 
রে না। এ ওর' সঙ্গে কথা বলে ভেবেচিন্তে-একটু-ব৷ 

অলস চিন্তার রোমন্থন করে চলেছে আইরিন । মনে মনে 
ভাবছে নানা কথা। নান৷ স্মৃতি এসে উঁকি দিচ্ছে মনে। 
চিন্তার সুতো ধরে এগোতে এগোতে আচমকা যদি মনে পড়ে 
যায় ভয়ঙ্কর এঁ ঘটনাটার কথা, অগ্নি সে চোখ তুলে 
তাকায়_চারপাশে ছড়ানো তার অতিপরিচিত জিনিসপত্র । কত 
পরিচিত আর কী আপন এই পরিবেশ ! এসব দেখে হৃদয়-মন 
শান্তি পায়, স্ব্তি পায়, বোধ করে পরম নিশ্চিন্ত । এই সব 
জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কত-না মধুর স্মৃতি! তাই 
এসবের প্রতি মমতার তার অস্ত নেই। তাই এ-সবের দিকে 
তাকালে মন হয়ে আসে প্রশান্ত । 

ঘড়িটা টিকটিক করছে হেলতে দুলতে, ঘরের স্তর 
ভাঙছে। ওর ওই ছন্দোময় ধ্বনি আইরিনের বিধ্বস্ত স্নায়ুর 
ওপর যেন বুলিয়ে দিচ্ছে শাস্তির প্রলেপ, সাস্তনা দিচ্ছে তাকে। 
জরোরুগীর মত তার নাড়ির ভাবক গতিকে ফিরিয়ে আনছে 
স্বাভাবিকতায়-_-ঘড়ির ওই ছন্দোময় টিকটিক ধ্বনি। 


২১ 


BAB REY Hee Beye 


5h + YS PCO 


পরের দিন সকাল । 

স্বামী অফিসে চলে গিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের বেড়াতে 
পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই আইরিন এখন কিছুক্ষণের জন্যে 
পেয়েছে নিরিবিলি অবসর । গতকালের ঘটনাট! এক! একা 
বসে ভাববার সুযোগ এল এই প্রথম । 

ভারী পাথরের মত ভয়ঙ্কর যে আতঙ্কটা কাল থেকে তার 
ওপর চেপে বসেছিল, শেষ পর্যন্ত আইরিন সেটাকে ঝেড়ে 
ফেলতে সক্ষম হল। 

কি আছে অত ভয়ের ? ওড়না দিয়ে মুখখানি তার ঢাকা 
ছিল--অতএব তাকে ও চিনতে পারেনি। পারা একেবারেই 
অসম্ভব । কাজেই এবার থেকে সাবধান হলেই চলবে । এখন 
সাবধান হওয়া কিছু শক্তও নয়। ভয়ের আর-কোন কারণই 
থাকবে না তাহলে । 

আইরিন ঠিক করল, আর কখনো প্রেমিকের বাসায় 
গিয়ে তার সাথে দেখা করবে না। কালকের ব্যাপারটার 
পুনরুক্তির কোন আশঙ্কাই তাহলে থাকবে না। 

আর, ওই “মাগী'টার কথাই যদি ধরে!--ওর পক্ষে ট্যাক্সি 
পর্যন্ত পিছু নেওয়! ব| কুকুরের মত গন্ধ শুকে শুকে বাড়ি 
পর্যন্ত এসে ধাওয়! কর!_অসম্ভব। সেদিক থেকে কোন ভয় 
নেই। আপাতত সেজন্ত মাথা না ঘামালেও চলবে। 
২১ 


সেতুবন্ধ 

না হয় ধরাই গেল, ‘ওই ইয়েট!” যে-করে হোক তার 
নামধামের হদিশ পেয়ে গিয়েছে। পাক হদিশ, সেক্ষেত্রেও 
আত্মরক্ষার উপায় রয়েছে অনেকরকম। 

একেবারে প্রত্যাসন্ন আতঙ্কের মুখোমুখি নয় বলে, আইরিন 
এখন মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভাবতে পারছে। পারছে নিজের 
কমপন্থা ঠিক করে নিতে। কিসের পরোয়া করে সে? 
যে-অভিযোগই করা হোক, সরাসরি মুখের ওপর অস্বীকার 
করবে। স্রেফ অব্বীকার। তবু যদি ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত 
ঘোরালে| হয়ে দাড়ায়-উল্টে ওই স্ত্রীলোকটাইে তখন 
ব্যাকমেলার বলে অভিযুক্ত করবে। ব্যস! 

: আইরিন তে! আর যে-সে মানুষের বউ নয়, শহরের অন্যতম 
সের৷ ব্যারিস্টারের গৃহিনী সে। এতদিন স্বামীর ঘর করে 
আইন-কানুন সে-ও এক-আধ্টু বোঝে বইকি! স্বামী যখন 
তাঁর সহকর্মীদের সাথে কথা বলেন, তখন সে চোখ-কান কিছু 
বুঝে থাকে ন|। ওঁদের কথাবার্তায় আইরিন জেনে গিয়েছে যে 
ব্ল্যাকমেলিং করা-লোককে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা 
ভীষণ অপরাধ। আইনে এর জন্যে রয়েছে কঠোর সাজার 
বিধান । 

সবচেয়ে আগে একটি কাজ করতে হবে? কয়েক দিনের 
জন্যে ওর সাথে দেখা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না 
এট! জানিয়ে দেওয়া দরকার। ছোট্ট একটা চিঠি লিখবে, 
যতদুর সম্ভব ছোট। কাল” ত্রস্টম্যানের পূর্বতন প্রেমিকা কিনা 


২২ 


সেতুবন্ধ 

ওই স্ত্ীলোকটা ? ওই রকম অতিসাধারণ নগণ্য জঘন্য একটা 
মেয়েমানুষ ! তার আগে কিনা ওই ছিল কালে'র প্রেয়সী ! 
ছিঃ ছিঃ ছিঃ! মানমৰ্ধাদা আর রইল ন!। এটা জানার পর 
থেকে গ্লানিতে আইরিন মরে যাচ্ছে প্রতিমুহর্তে । 

চিঠি লিখতে বসে আইরিন বেছে বেছে এমন সব শব্দ 
প্রয়োগ করতে লাগল যাতে করে তার মনের ভাবটা স্পষ্ট হয়ে 
ওঠে, স্পর্শকাতর একটি হৃদয়ে যাতে আঘাত লাগে প্রচণ্ড রকম। 
প্রকারাস্তরে কাল কে আইরিন জানিয়ে দিল--নেহাৎ খেয়ালের 
বশেই ওকে সে গ্রহণ করেছিল। ওর জন্যে কখনে। কোনরকম 
আবেগ-অধীরতা সে বোধ করেনি। প্রেম-ট্রেম নয়-_-এ নিতান্তই 
শাদামাঠ| একটা ব্যাপার । 

ছেলেটি পেশাদার পিয়ানোবাদক। এক ইভনিং পার্টিতে 
তার সাথে আলাপ হয় আইরিনের। এবং, কি-হচ্ছে-না-হচ্ছে 
ভালো করে বোঝার আগেই আইরিন পরিণত হয়ে যায় তার 
মিস্টেসে-_অর্থাৎ, প্রায় উপপত্নীতে। 

অথচ, আকৃষ্ট হবার মত বিশেষ-কিছুই ওর মধ্যে নেই। 
ওর জন্যে কখনো আইরিন বাসনাব্যাকুল হয়ে ওঠেনি। 
এমন-কি, দুজনের এই অন্তরঙ্গতার পেছনে আত্মিক কোন 
আকুতির প্রেরাও উল্লেখযোগ্য হয়ে ধরা পড়েনি কখনো 
কোনদিনও । 

নিজের দিক থেকে কোনরকম যৌন তাগিদ বোধ না করেই 
নিজেকে আইরিন সঁপে দিয়েছিল । তবে, দেহগত সাধ তার 


২৩ 


ফেতুবন্ধ 

ছিল ন! সত্যি, সেই সঙ্গে ওর ইচ্ছেয় বাধা দেওয়ার সাধ্যও 
ছিলনা। 

অবশ্যি, কৌতূহল ছিল। তরুণ যুবক কি করে প্রেম করে, 
প্রেম করে কি করে-_সেটা আবিষ্কারের কৌতূহল ৷ কিন্তু, এই 
কৌতূহলও তেমন-কিছু জোরালে| নয়। 

বিবাহিত জীবনে আইরিন সুখী হয়েছে। দৈহিক, মানসিক 
বা আত্বমিক প্রয়োজন মেটাবার জন্যে পরপুরুষের প্রয়োজন তার 
ছিল ন!। স্বামীই ছিলেন, এজন্যে । এসব ব্যাপারে তিনি 
তাকে পুরোপুরি তৃপ্ত করেছিলেন। 

এছাড়! রয়েছে তার দেবশিশুর মত দুটি ছেলেমেয়ে. স্বামী 
আর সম্ভান নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পরম স্থুখে সে দিন 
কাটাচ্ছিল। 

কিন্তু সহজে যা পাওয়! যায় অনেক সময় সেট! বোঝা হয়ে 
দাড়ায় । অতি সুখে দেখ| দেয় মনের অসুখ! জীবন হয়ে 
যায় বড় একঘেয়ে, অস্বস্তিকর। অতিতৃপ্তি ক্ষুধার মতই 
ক্ষতিকর পাকস্থলীর পক্ষে । 

আইরিনের বেলাতেও তাই ঘটল । নিরাপত্তা বন্দীত্ব বলে 
মনে হল তার কাছে। তাই সে উদগ্রীব হয়ে উঠল না-জানা 
রোমারঞ্চের আশায় । 

এমতাবস্থায় ওই তরুণ পিয়ানোবাদক যখন স্বীকার করে 
নিল তার নারীত্বের পৃথক সত্তা, এবং সেই হিশেবে তার 
মনোরঞ্জনের জন্যে উঠে পড়ে লাগল--ধরা না দিয়ে তখন উপায় 


২৪ 


সেতুবন্ধ 

আইরিনের রইল না৷ চেনাপরিচিত পুরুষদের কাছ থেকে 
একঘেয়ে স্তাবকত! আর প্রাণহীন শ্রদ্ধার প্রশস্তি শুনে শুনে সে 
ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল । স্ব ওলোটপালোট করে দিল পিয়ানো- 
বাদক। মন আইরিনের আনচান করে উঠল। আস্বাদ পেল 
বহু-আকাজ্তিত না-জানা রোমাঞ্চের ৷ 

কৈশোর পেরোবার পর থেকে এমন-কোন ঘটনা জীবনে: 
তার ঘটেনি, হৃদয়মনে যাতে প্রবল আবেগের আলোড়ন অনুভব 
করতে পারে। এবার ঘটল ব্যতিক্রম। 

সঙ্গীতশিল্পীর যে-জিনিসট! তাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট 
করেছিল তা হল ওর বিষগ্নত৷। বিষণ্তার মূর্তিমান প্রতীক 
যেন। চারপাশে ঘিরে রয়েছে অভিজ্জাত সমাজের স্ুখী-সন্তষ্ট 
নরনারীরা, চটকদার সাজপোশাক, চেহারাতেও জৌলুষের অস্ত 
নেই--এদেরই মাঝখানে বসে ও অন্বয় হয়ে পিয়ানে! বাজাচ্ছিল 
কী বিষ-কোমল মুখখানি! একেবারে বেমানান এই পরিবেশে! 

দেখেই অবঙ্ছা জাগে। আর, অবজ্ঞা জাগাই তো 
স্বাভাবিক । তবু, কেন-যে মন আইরিনের স্বাভাবিকতার গণ্ডি 
পেরিয়ে গেল! গভীরভাবে সে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল 
শিল্পীকে-_-মাথা হেঁট করে পিয়ানো! বাজিয়ে চলেছে। দেখলেই 
মনট| কেমন টনটন করে ওঠে। অপলক আইরিন তাকিয়ে 
রইল। 

বাজনার শেষে জানাল উচ্ছবসিত অভিনন্দন । বেছে বেছে 
এমন-সব বিশেষণ ব্যবহার করল, শুনে হকচকিয়ে গেল শিল্পী ৷ 


২ ২৫ 


সেতুবন্ধ 
কী-বোর্ড থেকে মাথা তুলে তাকাল বারেক-_সরাসরি তার 
সুখের দিকে। চোখাচোখি হল। 
প্রথমবার চোখাচোখি হতেই বুক গুরগুর করে উঠল 
-আইরিনের। আতঙ্ক বোধ করল হঠাৎ । 
শুধুই আতঙ্ক? না, আনন্দও মেশান রয়েছে এই আতঙ্কের 
সঙ্গে । 
দুচারটে কথার বিনময় হল। বলতে গেলে, নেহাৎই 
অর্থহীন অবাস্তর সেসব কথা। কিন্তু, অর্থহীন অবান্তর ওই 
কথাগ্ধুলিই দুটি নরনারীর হৃদয়ের গভীরে গিয়ে ঘা দিল। 
Bh আইরিন যেন মন্তযুগ্ধ ৷ দুর্বার হয়ে উঠল শিল্পীর সম্পর্কে 
কৌতুহল । শেষ পৰ্যন্ত নিজে থেকেই যেচে বলল, এরপর 
যেখানে ক্রস্টম্যান বাজাবে দয়| করে যেন একবার জানায় তাকে। 
‘আইরিন শুনতে যাবে। 
তারপর? তারপর আর কি-_প্রায়ই দেখাসাক্ষাৎ হতে 
‘লাগল । দৈবক্ৰমে অবশ্যই নয়। 
কয়েক সপ্তাহ পরে। ক্রস্টম্যান একদিন জানাল-_নতুন 
একটি সঙ্গীত সে রচনা করেছে। আইরিনকে শোনাতে চায়। 
“সকলের আগে আইরিনকে ! 
প্রস্তাব শুনে গর্বে-গৌরবে উপছে উঠল আইরিন। 
‘সত্যিকারের একজন শিল্পী, সর্বজনপরিচিত বিখ্যাত এক শিল্পী 
কিন! তার নতুন স্থষ্টির পরীক্ষক হিশেবে বেছে নিয়েছে তাকে? 
“এ যে অচিন্ত্যনীয় অবিশ্বাস্য ব্যাপার ! 


২৬ 


সেতুবন্ধ 

এক কথায় আইরিন রাজি হয়ে গেল ক্রস্টম্যানের ফ্ল্যাটে 
যেতে। 

হতে পারে, এর পেছনে কারোই কোন কুমতলব ছিল না। 
খোলা মনেই ফ্লাটে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ব্রস্টম্যান, কিছু না 
ভেবেই তার ফ্ল্যাটে যেতে রাজি হয়েছিল আইরিন। ব্যাপারটা 
ঘটে গেল কিন্ত অন্যরকম । 

গুধু চুম্ধনেই এর পরিসমাপ্তি হল না, ব্রষ্টম্যানের দাবির 
কাছে হার মেনে নিল আইরিন। স্বেচ্ছায় । 

কিন্তু পরে, বোধশক্তি ফিরে আসার সাথে সাথে, সে হয়ে 
গেল বিশ্ময়বিমূঢ়। এ কি করে বসল! এ কী সর্বনাশ করল! 
হঠাৎ এ কি মতিচ্ছন্ন হল তার! এ কী ভয়ানক ব্যাপার 
ঘটে গেল! 

বিয়ের শপথ ভাঙার ইচ্ছে তার মোটে.ছিল না। ওকথা : 
সে ভাবতেও পারে না। 

নিজেকে আইরিনের বড় অপরাধী মনে হতে লাগল । 

তবু-_অপরাধী মনে হওয়! সত্বেও--মনে মনে এখন সে গর্ব 
বোধ করছে। স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে-_আইরিন তাই মনে 
করে-স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে সে ছিড়ে ফেলেছে তথাকথিত 
আভিজাত্যের নিগড়। যে-শুঙ্ক নীতিবোধ আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে 
বেঁধে রেখেছিল, সাহস ভরে সেটাকে সে অস্বীকার করেছে। 
হবে ন! গর্ব! জীবনে এ তার এক অভিনব অভিজ্ঞতা । 
কুমতি তাকে আরো উস্কে দিল। 


২৭ 


সেতুবন্ধ 


রোমাঞ্চকর এই আবেগটা কিন্তু স্থায়ী হয় ন! বেশীক্ষণ। 
খানিক পরে স্বভাবতই ওর সম্পর্কে মনে বিরূপতা দেখা দেয় } 
বিশেষ করে, ওর পিয়ানো বাজনার ওপর। পিয়ানোই তো 
যত নষ্টের মূল । ওই বাজন! শুনেই না সে মজেছিল। 

ব্রস্টম্যান সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে যেমন পিয়ানো বাজায়, 
তেমনি প্রেমের বেলাতেই এগিয়ে যায় বেপরোয়! হয়ে। 
প্রিয়তমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুর্বার বাসনার জোয়ারে । 
দুদিকেই সে শক্তিমান পুরুষ । সবেতেই তার বাড়াবাড়ি । 

তার এই বাড়াবাড়িতে আইরিন অস্বস্তি বোধ করে। 
আপন! থেকেই স্বামীর সঙ্গে তুলনা! করে বসে কালে'র। স্বামী 
কত সংযত, কত স্ুবিবেচক ! এতদিন তো বিয়ে হয়েছে, এখনে! 
তবু তার লজ্জা ভাঙল ন!। স্ত্রীর সম্মতি না থাকলে নিজের 
খুশিমত তিনি আজে! কিছু করেন না। 

তবু, একবার যখন স্বামীর কাছে বিশ্বাসহন্তরী হয়েছে, তখন 
আর পিছন ফিরে লাভ কি! অন্তায় যা করবার তা তো করেই 
ফেলেছে, অসম্ভব এখন এর প্রতিবিধান। প্রেমিকের দিকেই 
ঢলে পড়ল আইরিন। সংস্কারের বাধাটা সরে যাওয়ার সাথে 
সাথে পথ হয়ে গেছে সহজ-সরল । 

অবৈধ এই মেলামেশায় সে যে খুর আনন্দ পায়, ত নয়। 
এ নিয়ে মনে তার কোনরকম মোহের সঞ্চারও হয় নি। 

কেনই বা আনন্দ পাবে? মোহের সঞ্চারই বা হবে কেন? 
নিছক উপপত্নীর কর্তব্য সে পালন করে যায়-_অবৈধ প্রেমিকের 


২৮ 


সেতুবন্ধ 

প্রতি উপপত্নবীর যে কর্তব্য । সেই সঙ্গে রয়েছে কেমন-যেন 
ক্লান্তি একট! । এতে বাধা দেবার উৎসাহটুকু পর্যন্ত নেই তার_ 
দেহ মন দু-ই ক্লান্ত, অবসন্ন । ধীরে ধীরে এটাই স্বাভাবিক 
হয়ে উঠল । পরিণত হল অভ্যাসে। 

কাটল এইভাবে মাসখানেক । তরুণ শিল্পীর ছোয়ায় তার 
জীবনের ধারা গেল বদলে ৷ কালে'র সাথে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ 
কর৷ আর-পীচটা কাজেরই অনিবার্য একট! অঙ্গ হয়ে 
দ্রাড়াল। প্রতি সপ্তাহে যেমন একবার করে শ্বশুর-শাশুড়ির 
সাথে দেখা করে আসে, বা আত্মীয়স্বজন কি বন্ধুবান্ধবের বাড়ি ' 
যায়-_এও যেন তেমনি। এর জন্যে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের 
কোন ব্যতিক্ৰম ঘটল না, আগের মতই চলতে লাগল সবকিছু 
শুধু বাড়তি একটা কাজ বাড়ল__এই যা । 

এমন কী অপ্রত্যাশিত আনন্দ কার্ল তাকে দিয়েছিল? 
কিছুই না। নতুন একটি সম্ভান হলে ব| আরেকটা গাড়ি 
কিনলে যে আনন্দ সে পেত, তার চেয়ে বেশি কিছু কার্ল 
তাকে দিতে পারে নি। দিন কয়েকের মধ্যেই এই নতুন 
রোমাঞ্চের স্বাদ হয়ে গেল পান্শে। অবৈধ প্রেমের আকর্ষণ 
সমাজস্বীকৃত দাম্পত্য সুখশাত্তিকে ছাপিয়ে যেতে পারল না। 

বিপদের প্রথম সংকেতেই আইরিন আজ বুঝতে পারছে _ 
কী ভয়ঙ্কর পরিণাম অবৈধ প্রেমের । ভাগ্য এতদিন, বলতে 
নেই, তার প্রতি সদয় ব্যবহারই করে এসেছে। ছেলেবেলা 
থেকে আদরে-সোহাগে মানুষ হয়েছে । অতিরিক্ত আদর দিয়ে 


২৯ 


সেতুবন্ধ 

দিয়ে বাপ-মাই তার মাথা! খেয়েছেন_একেবারে আহলাদী করে 
তুলেছেন। প্রাচ্যের সংসারে যখন যা| চেয়েছে, পেয়েছে। 
কখনো কোন ব্যাপারে হতাশ হতে হয় নি। 

এর ফলে মনট! তার হয়ে পড়েছে বড়ই স্পর্শকাতর। এবং ' 
একণগুয়ে, জেদী, আবদারে। মৃত্মন্দ হাওয়াতেই উদ্দাম হয়ে 
ওঠে মনের পাথার-ঝড়ের আভাষ বলে তাকে মনে করে 
আইরিন। প্রেমিকের জন্যে ব্যক্তিগত সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিন্দুমাত্র 
বিসর্জন দেওয়ার কথাও সে তাই ভাবতে পারে না ।------- 


সেদিন বিকেলেই কাল-এর কাছ থেকে চিঠি এল । সেকী 
চিঠি ! চিঠির ছত্রে ছত্রে উত্তেজন! ফুটে বেরোচ্ছে_কত অনুনয় 
জানিয়েছে! ভংপসন| করেছে নানাভাবে । এসব কী মাথামুু 
লিখেছে আইরিন! 

চিঠি পড়ে আবার সব গোলমাল হয়ে যায়। ব্যাপারটার 
এখানেই ইতি করে দেবে কিনা আইরিন বুঝে উঠতে পারে 
ন!। তার সম্পর্কে ও সরাসরি যেমন অনল উচ্ছাস জানিয়েছে, 
সেট! স্তাবকতারই নামাস্তর। গর্ব সেজন্কে হচ্ছে, সত্যি । ওর 
হতাশার এমন বেপরোয়া প্রকাশ দেখে মনটাও যেন কেমন-কেমন 
করছে। কী-যে এখন কর্তব্য তার! 

অনেক কাকুতি-মিনতি করে কাল লিখেছে--দয়া করে আর 
একবার অন্তত তার সাথে আইরিন দেখা করুক, তাহলেই ‘সে 
বুঝতে পারবে কি ব্যাপার, কি বৃত্তান্ত । কেন আইরিন হঠাৎ তার 


৩০ 


সেতুবন্ধ 
প্রতি বিমুখ হল ? ন! জেনে সে-ই যদি কোন অপরাধ করে 
থাকে, হাতে ধরে মাপ চেয়ে নেবে। শুধু একবার আইরিন দেখা 
করুক--আর একবার শুধু ! 

আইরিন যেন নতুন একটা খেলা পেয়ে গেল। নিজের 
মনের কথা জানতে দেবে না, থাকুক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ৷ 
এর ফলে ওর কাছে তার দাম বেড়ে যাবে অনেক গুণ। 

এই ভেবে দিনক্ষণ স্থির করে একটা চায়ের দোকানে দেখা 
করবার জন্যে ওকে লিখে দিল। অনেক দিন আগে, তখন তারা 
বালিকা বয়েস, ওই চায়ের দোকানেই আইরিন দেখা করেছিল 
এক অভিনেতার সঙ্গে । অভিনেতাটি সম্পর্কে মনে তার ক্ষণিক 
মোহের সঞ্চার হয়েছিল-_অনেক দিন আগে । প্রথম কৈশোরের 
সেই উৎসাহ-উত্তেজনার কথা আজ কত তুচ্ছ, কী অকিঞ্চিৎকর 
বলেই না মনে হয়! তারপর বিয়ে হয়ে গেল । এতদিন বিবাহিত, 
জীবন কাটাল। আজ স্বামী রয়েছেন, তা ছাড়াও এক প্রেমিক 
সে জুটিয়েছে_সেদিনের কথা আজ স্বপ্ন বলে মনে হয়। 

‘সত্যি, কী আশ্চর্য মানুষের জীবন!!! আপন মনে স্বপ্নাচ্ছন্ন 
স্থুরে কথা কইতে লাগল আইরিন! ‘জীবনে আবার রোমান্স 
এল ! আমার জীবনে!’ 

শুধু, ‘ওই ইয়েটা'র কথা কীটার মত মনে বিধছে। নইলে' 
আইরিন এখন খুশি বইকি। প্রবল আবেগের মত এমন 
রোমাঞ্চকর ঘটনার আস্বাদ অনেকদিন সে অন্তুভব করেনি ॥ 
ধীরে ধীরে মন তার শান্ত হয়ে আসে, শরীরটা ঝরঝরে হয়ে ওঠে ৷ 


৩১ 


আইরিন ঠিক করল-_এবার দেখা করতে যাবে কালে! রঙের 
গাউন পরে, অন্ত-একট! টুপি মাথায় দিয়ে । তাহলে দৈবাৎ যদি : 
‘ইয়েটা'র মুখোমুখি পড়েও যায়, ভয়ের কারণ থাকবে না 
‘য়েটা’ কিছুতেই তাকে চিনতে পারবেন! । সেই সঙ্গে মুখ 
চাকবার জন্যে ওড়নাও নিচ্ছিল, কিন্তু পরতে গিয়ে মন বেঁকে 
বসল--ওড়ন| নেবে কেন? তার মত সম্তরান্ত, সম্মানভাজন এক 
মহিল| ওড়নায় মুখ ঢেকে পথে বেরোবে ? মুখ তুলে প্রকাশ্য 
রাজপথ দিয়ে চলার সাহসটুকুও তার থাকবে না? কেন সে 
মিছে ভয় পাচ্ছে ? ওড়নাটা ড্রয়ারে গুজে রেখে দিল আইরিন। 

ভয়ের তার কারণ নেই কোন। 

কিন্তু, বাড়ির নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে পা বাড়ান মাত্র ভয়ে 
এসে তার বুক চেপে ধরল । সাঁতারু যেন বরফশীতল জলে 
পায়ের বুড়ে। আঙ্গুলটি সবে ছু'ইয়েছে_শির শির করে উঠল 
স্বশরীর । 

এ-আতঙ্ক অবিশ্যি নেহাৎই ক্ষণিক । পরমুহর্তই মন পুলকিত 
হয়ে ওঠে । আর যাই হোক, আনন্দের রোমাঞ্চ রয়েছে এই 
অভিসারে। সহজ ভাবে হাঁটতে লাগল আইরিন, বুক ফুলিয়ে 
হেঁটে চলল সাহসিকার মত। 

আফসোস শুধু এই, চায়ের দোকানটা বাড়ির বড় কাছে। 
একবার পথে নামলে আর-কিছুর তোয়াক্কা সে রাখে না। 


৩২ 


ip 


সেতুবন্ধ 

নিজের পদধধ্বনিই চলার প্রেরণা যোগায়, চুম্বকের মত টেনে 
নিয়ে চলে-_অনেক দৃূর-দূর পথ আইরিন তখন পাড়ি দিতে পারে 
অনায়াসে। 

যাক, এখন ওসব ভেবে দরকার নেই। দেখা করার 
নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেছে। ও নিশ্চয় হা-পিত্যেশ করে 
রয়েছে। কি ভাবছে কে জানে! 

কার্ল” বসে ছিল দোকানের এক নির্জন কোণে। থেকে 
থেকে খালি তাকাচ্ছিল দরজার দিকে। 

ছটফট করছিল অধীরতায়। 

আইরিনকে ঢুকতে দেখেই তড়াক করে উঠে দাড়াল 

তার এই অধীরতা ভালো লাগল আইরিনের। ভালো 
লাগল, সেই সাথে বিতৃষ্ণাও জাগল কিছুট!। কেনন! 
যে-উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে সেটা ভুলে গেলে চলবে না। সংযত 
হয়ে কথা বলবার জন্যে, আবোলতাবোল না বকবার জন্যে এক্ষুণি 
ওকে সাবধান করে দিতে হবে। 

ওর সঙ্গে কেন সে দেখা করতে চায় না-স্পষ্ট করে 
সেকথা আইরিন বলল ন!। এটা-ওট! নানা কথায়, আভাষে- 
ইন্সিতে জানিয়ে দিতে চাইল কারণট! ৷ তার ফলে, মুষড়ে পড়া 
দুরে থাক, কাল হয়ে উঠল আরে! উদ্দীপ্ত । প্রিয়তমার মান 
ভাঁঙাবার জন্যে উঠে পড়ে লেগে গেল। 

কাঠ হয়ে বসে রইল আইরিন! কালের প্রেমালাপে 
একটুও সাড়া দিল না। সাড়া না দিলেও সে কিন্তু ভালো ভাবেই 


৩৩ 


সেতুবন্ধ 

বুঝছে যে ফল এতে কিছু হবে না। হঠাৎ এভাবে এবং বাহত 
অকারণে মেলামেশা বন্ধ করে দিলে দমে যাওয়ার বদলে শিল্পী 
হয়ে উঠবে আরো-বেশি উদ্দাম । 

আধঘণ্টাটাক জোর কথ! কাটাকাটি করে কালে'র কাছ থেকে 
মে বিদায় নিল । কার্ল সোহাগ জানাতে এসেছিল, আইরিন 
তাকে ছু'তে পর্যন্ত দিল না। কালের হাজার মিনতিতেও 
ভবিষ্যৎ দেখাসাক্ষাৎ সম্পর্কে একটি কথাও বলল না। 

বাড়ি ফিরে এল খুশি মনে-_এতখানি খুশি কৈশোর 
পেরোবার পর কোনোদিন সে হয় নি। মনে হচ্ছে, তার সত্তার 
গভীরে যেন জলে উঠেছে আনন্দের একটি ক্ষীণ শিখ!। এই 
ক্ষীণ শিখাটিকে সর্বগ্রাসী আগুণে পরিণত করার জন্যে প্রয়োজন 
এখন ঝড়ে| হাওয়ার । 

রাস্তার লোকজন মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে তাকে দেখছে। 
ভালো লাগছে আইরিনের। পুরুষের সপ্রশংস দৃষ্টি সম্পর্কে 
এতখানি সচেতন সে কোনদিন ছিল না। আইরিন অভিভূত 
হয়ে পড়ে । কী এত ওরা দেখছে তার দিকে চেয়ে! সত্যিই 
কি সে এত সুন্দর ? 

একটা ফুলের দোকানের সামনে দাড়িয়ে পড়ে আইরিন, 
দাড়াতে বাধ্য হয়। দোকানের আয়নার দিকে তাকায়, মুগ্ধ 
চোখে দেখতে থাকে নিজের মুখখানি । 

থরে থরে সাজানো লাল গোলাপ আর শিশির-ভেজ! 
ভাঁয়োলেটের মাবখানে কী অপরূপ যে দাখাচ্ছে মুখখানি তার! 


৩৪ 


সেতুবন্ধ 


আয়নায় নিজের প্রতিবিসশ্বের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তিতে হৃদয় 
আইরিনের ভরে যায় কানায় কানায় ।--কী অপুর্ব সুন্দর আমি! 

পাখির মত হালকা লাগছে দেহটি। কৈশোর পেরিয়ে এসে 
এমন শিশুয়ালী আনন্দ, এতখানি ইন্দিয়সক্তি আর কখনো 
সে অন্কুভব করে নি। বিয়ের প্রথম দিকেও না, প্রেমিকের 
বাহুবন্ধনেও নয়। আনন্দের বন্তায় আইরিন যেন ভেসে চলেছে, 
দেহের প্রতিটি অনুপরমাণু তার জ্বলে উঠেছে কী-এক পরশমণির 
ছোয়া পেয়ে । এ-আনন্দের আস্বাদ স্বামী বা প্রেমিক কারো 
কাছ থেকেই সে পায় নি এতকাল ৷ 

মদিরমধুর এই উত্তেজনাকে বৃথা যেতে দেওয়| যায় না 
আইরিন ভাবল । আবার সেই দৈনন্দিন জীবনের ঘেরাটোপে 
ফিরে যেতে হবে--ভাবতেও গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। 

কিন্ত, যেতে তবু হবেই। বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! বড় 
পরিশ্রান্ত ! কোন মতে নিজেকে আইরিন বাড়ির দিকে টেনে 
চলল। 

দরজায় পৌছে দাড়াল বারেক । শেষবারের মত উপভোগ 
করে নিতে চায় নতুন-পাওয়! এই অভিজ্ঞতার সৌরভটুকু । 
মাথ! হেলিয়ে দিল পিছন দিকে, বুক ভরে শ্বাস টেনে নিল। 

হঠাৎ জামার আঁত্তিনে টান পড়তেই আইরিন সচেতন হয়ে 
ওঠে, আচমকা এক ধাক্কায় যেন জেগে ওঠে স্বপ্নের ঘোর থেকে 

‘কে?’ চকিতে সে ঘুরে দ'ড়াল, ‘আঁযা ! কি-আবার কী 
চাঁও তুমি? ফের তুমি আমায় জ্বালাতে এসেছ !! ক্ষেপে গেল 


৩৫ 


সেতুবন্ধ 

আইরিন। সে-সেই ঘৃণ্য স্ত্রীলোকটা ! বাড়ি পর্যন্ত এসে 
খাওয়া করেছে! 

কথাগুলো বলে ফেলেই কিন্তু ঠোঁট কামড়ে ধরল। কী 
সর্বনাশ! একি করল! স্বেচ্ছায় ধরা দিল! আইরিন কী প্রতি্ঞা 
করে নি যে ফের ‘ওই ইয়েট!” এসে হামল! করলে ওকে সে 
আচ্ছা শিক্ষা দিয়ে দেবে? জন্মের মত ভেঙে দেবে ওর বিষদাত ? 

এখন আর উপায় নেই। সে-ই ওর ফাদে পড়ে গিয়েছে। 
সাধ করে নিজেই ডেকে এনেছে নিজের সর্বনাশ--মুহূর্ত্ের ভুলে, 
ক্ষণিক উত্তেজনার বশে । জীবনভোর ভুগতে হবে এর জন্যে । 

‘আপনার তরে কখন থেকে দাইড়ে আছি, ফ্রাউ ভাগনার। 
ত ঘণ্টাটাক তে 

হায়! হায়! হায়! আইরিনের নামধামও জেনে গিয়েছে! 
কি করে জানল? কে জানাল? গেল! সব এবার গেল! 
সৰ্বনাশ হল! 

হ্যা, তা ঘণ্টাটাক তে বটেই !! মুখ বেঁকিয়ে ভংসনার 
সুরে বলল স্ত্রীলোকটি। 

‘কী চাও?’ 

‘সে তে আপনি বুঝতেই পারছ:-.মুখ ফুটে আপনাকে 
আর কি বলব, ফ্রাউ ভাগনার, আমি যে কিসের তরে এসিছি_’ 

‘কিন্তঁ-তারপর থেকে ওর সাথে আমি.:-আর আমি ওর 
সাথে তে দেখ! করিনি । তোমাকেই তে! বলেইছিলুম যে আর 
ওর সাথে আমি দেখা করবো না-_আর কক্ষনে!--' 


৩৬ 


সেতুবন্ধ 

প্ুধুসুধু কেন মিছে কথাগুনে| বলছ গা ? চায়ের দোকান 
তক তোমার পিছু পিছু আমি গিয়েছিন্ন, বুঝতাল্লে,'--তা মরুক 
গে যাক'--দেখ বাপু, চাকরিবাকরি নেই আমার, ছাটাই হয়ে 
গিইছি। মালিক বললে, ব্যাবসাপত্তরের অবস্তা বড় খারাপ --- 
আর একট! জোটাতেও পারছিনি। অবিশ্যি তোমার মতন 
ভদ্দরনোক মেয়েছেলে হলে কি চাকরির তোয়াক্কা করতুন_ 
হেথাহোথা ঘুরেফিরে হেসেখেলে মজাসে-----"' 

কথার স্বরে ঝরে পড়ছে তিক্ত জ্বালা আর অকথ্য ঈর্ষী ৷ 
দম যেন আইরিনের বন্ধ হয়ে আসে। স্ত্রীলোকটির নিলজ্জ 
কুৎসিৎ বেহায়াপনার কাছে সে বোবা! হয়ে যায়। 

মুখ ফুটে আইরিন একটি কথারও প্রতিবাদ করতে 
পারল ন|। পরিণত হল ওর অনায়াস শিকারে। 

আর, সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিল অপরিসীম আতঙ্ক । অবিকল 
আগেকার মত। 
__ ধরে, ও যদি আরও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলতে শুরু করে 

তাহলে তে নির্থাৎ ঝি-চাকরদের কানে যাবে? বিস্বা, 

স্বামীই যদি এখন এসে পড়েন ?'-- 

ভাববার অবসর নেই, তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলল আইরিন । 
হাতের মুঠোয় য! পেল সব বার করে এনে গু'জে দিল 
স্ত্রীলোকটির কড়াপড়া হাতে৷ 

কিন্তু টাকা পেয়েও করতলের হাঁ-টা বুজে যাওয়া দুরে থাক, 
তেমনি প্রসারিত হয়ে রইল_হিংস্র পশুর লোলুপ থাবার মত । 


৩৭ 


সেতুবন্ধ 

“ব্যাগটাও দিয়ে দাও ঠাকরুন, খুচরোগুনোই বা বাদ যায় 
কেন! মুখ বেঁকিয়ে বলল স্ত্রীলোকটি। হেসে উঠল খিক 
খিক করে। { 

মুখোমুখি তাকাল আইরিন। মনটা ঘৃণায় রী রী করছে। 
রাগে জলে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ। উপায় নেই! তবু কিছু করবার 
উপায় নেই। যে করেই হোক মুক্তি এর হাত থেকে পেতেই 
হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিটিয়ে ফেলতে হবে অতীতের জের । 

চোখ ঘোচ করে চেয়ে আছে ‘ইয়েটা,” পাছে ওর সাথে ফের 
চোখাচোখি হয়ে যায়-_আইরিন পাশ ফিরল। ফিরে দামী 
হাতব্যাগটা ছুড়ে দিল ওর তামাটে থাবায়। তারপর এক 
যুহূর্তও আর দ'ড়াল ন৷। সশব্দে দরজা বন্ধ করেই উর্ধশ্বাসে 
উঠতে লাগল 'সি'ড়ি বেয়ে । 

হের ভাগনার এখনে! বাড়ি ফেরেন নি। 

যাক, খানিকট! সময় অবসর পাওয়া যাবে। অবসর পাওয়া 
যাবে নিজেকে সামলে নেবার। বিছানায় এসে হুমড়ি খেয়ে 
পড়ল আইরিন। 

পড়ে রইল স্তন্ধ হয়ে । মরা মানুষের মত অচঞ্চল ৷ 

কিন্তু কতক্ষণই ব! ! হলঘরে স্বামীর গলার স্বর শোনামাত্র 
স্্রিংয়ের মত উঠে দাড়ায় । টুকটুক করে যন্ত্রচালিতের মত গিয়ে 
ঢোকে খাবার ঘরে। তার সমস্ত প্রাণশক্তি যেন নিংড়ে বার 
করে নেওয়| হয়েছে। 


C৮ 


এরপর থেকে ওই স্ত্রীলোকটা আইরিনের সর্বসময়ের সাথী 
হয়ে দাড়াল । চব্বিশ ঘণ্টা তার উপস্থিতি আইরিন মর্মে মর্মে 
অনুভব করে। আইরিন এঘর থেকে ওঘরে গেলেও সে যেন 
তার পিছু নেয়। 

সময় কারে! জন্যে অপেক্ষা করে না। এ'কদিনে আইরিন 
সমস্ত ব্যাপারটা আগাগোড়া ভালো করে ভেবে দেখবার যথেষ্ট 
সুযোগ পেয়েছে। ভেবেওছে। 

‘ওই ইয়েট!’ কি করে তার নামধাম জানতে পারল? 
আইরিন ভেবে পায় নি। তবে এটুকু বুঝেছে--যে-করেই 
পারুক, ওর কবল থেকে রেহাই নেই। একবার যখন প্রশ্রয় 
পেয়েছে, কিছুতেই আর ছাড়বে ন! । বছরের পর বহর এই 
দুর্বহ বোঝার, এই দুঃসহ দুর্ভাগ্যের জের টেনে তাকে চলতে 
হবে। এর থেকে মুক্তির কোন পথ আইরিন খুঁজে পাচ্ছে না। 

নিজের তার কিছু সম্পত্তি রয়েছে সত্যি, এবং বলতে নেই, 
স্বামীও রোজগার ভালোই করেন-_তবু স্বামীকে না জানিয়ে 
কতকাল ‘ইয়েটার’ দাবি সে মেটাতে পারবে? দিনকে দিন 
ওর দাবির বহর তে! বেড়েই চলেছে। 

এতকাল ব্যারিস্টার স্বামীর ঘর করে এটা সে ভালোভাবেই 
বুঝে নিয়েছে যে এধরনের লোকদের-__ব্ল্যাকমেলারদের_ 
বিশ্বাস নেই কোনমতে ৷ ওর! যা চাইবে তা-ই যদি দিয়ে 


৩৯ 


সেতুবন্ধ 

দাও তবু ভবিষ্যতে ফের এসে ওরা হানা দিতে পারে। হয়ত 
মাসখানেক, কি মাসহুই বড়জোর শান্তিতে কাটাল_তারপর 
হঠাৎ একদিন দেখবে ফের শুরু হয়ে গেছে৷ পুরনো! খেলা 
নতুন করে। 

আর, যদি তুমি রুখে দাড়াও, যদি ওর কাছে নতি স্বীকার 
না করো-দুর্ননম ও কলঙ্কের দুরপনেয় কালি লাগবে তোমার 
গায়ে। শুধু তোমার নয়, তোমার সংসারের নামে পর্যন্ত বদনাম 
রটবে। ঢি ঢি পড়ে যাবে সর্বত্র । 

তার চেয়ে, এভাবে সপরিবারে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়ে_ 
ব্্যাকমেলারের মন যুগিয়ে চলাও খেয়ে । 

আচ্ছা, কী হতে পারে শেষ পর্যন্ত ? 

দিনরাত আইরিনের এই এক দুশ্চিন্তা । 

সে যেন স্পষ্ট দেখতে পায়-_একদিন খ্বামীর নামে এল 
একটা উড়ো চিঠি। স্বামী পড়লেন, পড়তে পড়তে ভুরু দুটো 
তার জুড়ে গেল, মুখখান! হয়ে গেল ছাইয়ের মত। তারপর--- 

তারপর তিনি হয়ত এসে শক্ত মুঠোয় তার কিট! চেপে 


জিজ্ঞেস করবেন'--কিন্তঁ_তারপর ? তারপর কি করবেন 
তিনি? কী করবেন তা-র-প-র? 

আর আইরিন ভাবতে পারেন৷ । চোখের সামনে আঁধার 
ঘনিয়ে আসে৷ আতন্ক_অমান্ুযষিক অপরিসীম আতঙ্কে সে 
অভিভূত হয়ে যায়। 


সেতুবন্ধ Kt 

ভাবতে ভাবতে একটা সত্য আইরিন আবিষ্কার করল 
এতদিন স্বামীর ঘর করছে, অথচ তার চরিত্র সম্পর্কে কিছুই সে 
জানেন|। উনি যে কোন ধরনের মানুষ আজো আইরিন বুঝে 
উঠতে পারে নি। এমন একটা ব্যাপার যদি ঘটেই যায় 
তাহলে কী করবেন উনি-ঘুণাক্ষরেও সে আন্দাজ করতে 
পাঁরছে না। 

দুপক্ষের বাপ-মারা মিলে এই বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। 
বিয়েতে কোনরকম বাধ! আইরিন দেয়নি । বিন! দ্বিধায় 
একে মেনে নিয়েছিল । আট বছরের দাম্পত্য জীবনে ক্ষণিকের 
তরেও সেজন্যে আফসোস জাগেনি। বড় সুখে ও স্বচ্ছন্দে এই 
কটি বছর কেটে গিয়েছে। দুটি সম্ভানের মা হয়েছে, সংসারটি 
নিজের মনের মত করে গড়ে তুলেছে। ঘন্টার পর ঘণ্টা 
কাটিয়েছে স্বামীর সঙ্গে, উপভোগ করেছে দেহমিলনের স্বগীয় 
পুলক ৷ 

তবু, আজও সে ওঁর মনের হদিশ জানেনা । অনেক ব্যাপারে 
স্বামীর মনোভাব আজে! সে আন্দাজ করতেও পারেনা । 

আজ প্রথম আইরিন স্বামীর মন-মেজাজ বিশ্লেষণের প্রয়াস 
পেল। তীর চরিত্রের প্রধান প্রধান দিকগুলি পরীক্ষা করে 
দেখতে চাইল। ছোটখাট আপাততুচ্ছ ঘটনা দিয়েই মানুষকে 
চেন! যায়__সেই সব ঘটনাগুলি এখন একে একে মনে আনবার 
চেষ্ট৷ করল। ভাবতে লাগল তন্ময় হয়ে। 

যত ভাবে, তত বেশি জাগে আতঙ্ক ।---..- 


৩ ‘ 82 


সেতুবন্ধ 


স্বামী বসে বসে বই পড়ছেন। ইলেকটি.কের আলোয় 
মুখখানি তার আলোকিত হয়ে উঠেছে। তার মুখের দিকে 
তাকিয়ে আঁইরিনের মনে হয়--উনি যেন স্বামী নন তার, অজানা 
“এক আগন্তক । 

চোখযুখে পৌরুষের কী দীপ্তি ! পড়ছেন একমনে-__মানসিক 
ক্রিয়ার অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে প্রশস্ত কপালে, ঘন ভুরুতে। 
চাপ! ঠোঁট, সুগঠিত চোয়াল_দেখেই মনে হয় অতিরিক্ত গস্তীর 
প্রকৃতির মানুষ । কখনো কারে! কাছে মাথা হেঁট করেন না। 

শক্তসমর্থ চেহারা, শক্তিমান পুরুষ--তবু, কত সুন্দর ! 

আইরিন অবাক হয়ে যায়। 

সাধ জাগছে ওঁর চোখে চোখে চাইতে, কিন্তু চোখ ছুটি যে 
অবনত বইয়ের পাতায়। 

অথচ চোখের দিকে তাকালেই মাহ্ুষটার পরিপূর্ণ পরিচয় সে 
পেয়ে যেত- কোন সন্দেহ তার নেই । 

একদৃষ্টে আইরিন তাকিয়ে রইল স্বামীর মুখের দিকে-পাশ 
থেকে মুখের আধখানা দেখা যাচ্ছে। এই প্রথম স্বামীর দিকে 
তাকিয়ে অপার বিস্ময় জেগে উঠেছে মনে তার।'--আইরিনের 
অধঃপতনের কথা শুনলে উনি কি শুধু একবার ধমক দিয়েই 
ছেড়ে দেবেন ? শুধু সাবধান করে দেবেন ভবিষ্যতের জন্তে ?'-- 
নাকি, জন্মের মত তাকে পরিত্যাগ করবেন ?'-“চেয়ারে বসে 
রয়েছে এক অপরিচিত আগস্তক ৷ ওুঁর মুখের দিকে তাকালে 
শরীর শিউরে ওঠে। অথচ, মুখখানা কী সুন্দর ! কত মনোহর ! 


৪২ 


সেতুবন্ধ 

, বিয়ের এতগুলি বছর পরে আজ প্রথম আইরিন এটা লক্ষ্য 
' করল ।---শুধু ওঁর'মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেই আনন্দে মন 
ভরে যায়-_এ-আনন্দের সাথে মেশানেো| রয়েছে গর্ব । গরৰে 
বুক উপছে ওঠে।--‘সাধ যায় চিরকাল এইভাবে তাকিয়ে 
থাকতে ।--. 

হঠাৎ স্বামী চোখ তুললেন, বিদ্যৎস্পৃষ্টের মত সরে গেল 
আইরিন। অন্ধকারে গিয়ে আত্মগোপন করল। 

তার নিজের চোখে ফুটে উঠেছে যে দুরন্ত জিজ্ঞাস! পাছে সে 
বিশ্বাসঘাতকত৷ করে বসে তার সাথে-_আইরিন তাই পালিয়ে 
গেল । § 


5৩ 


তিনদিন আইরিন বাড়ি থেকে বের হল না । 

তার এই হঠাৎ অভ্যাস পরিবর্তনে ঝি-চাকরর| অবাক হয়ে 
যায়। ছেলেমেয়ে পর্যন্ত, বিশেষ করে ছেলেটি । মা-মণি কেন 
আর আজকাল বেড়াতে বেরোন ন! ? ছেলেটি তো একদিন 
সরাসরি প্রশ্নই করে বসে। গভনে'পও উশখুশ করে। সুযোগ 
পেলেই এর-ওর কাছে কথাটা তোলে-_ব্যাপার কি? হল কি 
বাড়ির গিন্নির ? 

এদিকে আইরিন প্রাণপণে চেষ্টা করে স্বাভাবিক থাকবার 
সব সময় মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখে_অস্বাভাবিক যেন কিছুই 
ঘটেনি জীবনে তার। সাধারণত সে ঘর-গেরস্থালীর খুটিনাটি 
নিয়ে ঘামায় না, এখন সংসারের নান! কাজেও হাত দিতে যায়। 
তার ফলে হয় হিতে বিপরীত। ভণ্ডুল করে ফেলে কাজকর্ম। 
পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও ঘোরালো। . 

পড়াশোনা বা সেলাই নিয়ে ভুলে থাকবে, তারও যো নেই । 
চাপা আতঙ্কে কেবলি ছট্‌ফট্‌ করে। স্থির হয়ে বসতে পারে ন! 
দু'দণ্ড। সদরে ঘণ্টাধবনি হলেই আঁংৎকে ওঠে। টেলিফোনের 
ক্রিং ক্রিং শুনলেই চ্যাৎ করে ওঠে বুক। দম বন্ধ হয়ে আনে 
আতঙ্কে । 

জীবন আইরিনের দুবিষহ হয়ে উঠল । 

ভবিষ্যতের ভয়ঙ্কর ছবি ফুটে ওঠে চোখের সামনে--এর 


88 


সেতুবন্ধ 

থেকে পরিত্রাণের পথ নেই! কোন উপায় নেই উদ্ধারের! 
দুঃখে, ক্ষোভে, হতাশায় সে একেবারে ভেঙে পড়ে । তিনদিন 
মাত্র বাড়ি থেকে বেরোয় নি, অথচ মনে হয়--কতকাল ধরে 
যেন বন্দিনী হয়ে রয়েছে। আট বছরের দাম্পত্য-জীবনের 
চেয়েও এই বন্দিত্বের মেয়াদি যেন অনেক ; অনেক গুণ বেশি। 

তৃতীয় সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে পড়ল, একজনের সাথে না তার 
দেখ! করার কথা ছিল কদিন আগেই ? অথচ'-.না, এভাবে 
দিন চলতে পারে ন! ৷ যদি বীচতে হয়, ফের যদি মাথা উচু 
করে চলতে হয়_আতঙ্কের বশীভূত হলে চলবে ন|। এই 
আতঙ্ক দুর্ভে্য প্রাচীরের মত চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে 
ধরেছে, পিষে ফেলতে চাইছে--ধূলিসাৎ একে করতেই হবে। 
মানুষের সাহচর্য তার চাই। ঘণ্টাকয়েকের জন্যে অস্তুত এই 
দুঃসহ একাকীত্বের হাত থেকে, আতঙ্কের এই হিংঅ্র কবল থেকে 
মুক্তি তাকে পেতেই হবে। নইলে সহজ-স্বাভাবিক মানুষ সে 
কখনোই হয়ে উঠতে পারবে না। 

তাছাড়া, এই ঘর, এই বাড়ি, পরিচিত এই পরিবেশ 
প্রতিমুহূর্তে তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই কথ|। কিছুক্ষণের 
জন্যে তাই এর থেকে দূরে সরে যেতে হবে। . বন্ধুবান্ধবের 
সাহচর্যই তে! সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই সময়। 


রাস্তায় পা দেবে, হঠাৎ বুকটা! দুরহ্ুর করে ওঠে । আতঙ্ক! 
সেই আতঙ্কটা যেন তার হিমশীতল হাত দিয়ে মুঠো করে ধরেছে 


8৫ 


সেতুবন্ধ 

আইরিনের হৃৎপিণ্_'ইয়েটা’ কোথাও ঘাপটি মেরে নেই তে? 
শক্ত মুঠোয় স্বামীর হাতটা সে জড়িয়ে ধরল । পা বাড়াল 
চোখ বুজে ৷ এগোল পুতুলের মত। কোনমতে গিয়ে উঠে 
বসল গাড়িতে ৷ 

হু হু করে গাড়ি চলেছে এবার নিজেকে সামলে নেয় 
আইরিন। গাড়ির গতিবেগে আতঙ্কটা ধীরে ধীরে উবে যায়। 

বন্ধুর বাড়ি পৌছে সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল-_যাক! আর 
ভয় নেই। এতক্ষণে নিশ্চিন্ত । 

ঘণ্টা দুই তিনের জন্যে আইরিন একেবারে মানুষ হয়ে গেল৷ 
খুশিতে উচ্ছ্বসিত । হাস্তময়ী লাস্তময়ী চিরস্তন তরুণী । সদ্য 
বন্দিদশ| থেকে মুক্তির আনন্দে কিছুটা-বা বেশি চপল । 

শত্রু এখানে তার নাগাল পাবে না। ভয় এসে এখানে 
হানা দিতে পারবে ন!। চারপাশে যার| রয়েছে এর! তাকে 
ভালোবাসে, তাকে শ্রদ্ধা করে। অভিজাত সমাজের নরনারী 
এর|__এদের চোখেমুখে সাজপোশাকে খুশির রোশনাই। 
কোনরকম দুর্ভাবনার বালাই নেই। হেসেখেলে এরা জীবন 
কাটায় অবাধ আনন্দে । সেই অবাধ আনন্দের স্রোতে এরা 
আইরিনকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেল, ভুলিয়ে দিল তার মানসিক 
যাতনা ৷ 

আনন্দে আইরিন বাঁধনহারা। স্বামীর হাত ধরে যখন 
এখানে এসে ঢোকে, সকলের চোখে ফুটে উঠেছিল বিমুগ্ধ বিস্ময় ! 
তাই দেখেই সে বুঝে গিয়েছিল _আজ তাকে দ্যাখাচ্ছে অপরূপ ৷ 


8৬ 


সেতুবন্ধ 
সঙ্গে সঙ্গে আত্মসচেতন হয়ে উঠেছিল। তাকে সুন্দরতর করে: 
তুলেছে সেই চেতনা । 

পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে যন্ত্রসঙ্গীতের সুরবঙ্কার ॥ 
সুরের বস্কার বাঙ্কৃত হচ্ছে দেহের প্রতিটি অনুপরমান্ু, উদ্দাম হয়ে' 
উঠেছে রক্তস্রোত । সবাই নাচছে। আইরিনও নিজেকে সংযত 
রাখতে পারে ন|। নিজের অজাত্তে সে-ও নাচতে শুরু করে 
দেয় ছন্দের তালে তালে-_নৃত্যপরা নরনারীদের সাথে মিশে 
যায় একাকার হয়ে ।. দেহমনে আর কণামাত্র গ্লানি নেই 
শরীরটি যেন তার সুসম ছন্দে পরিণত । 

হঠাৎ থেমে গেল সঙ্গীতবঙ্কার, হঠাৎ নেমে এল স্তন্ধত! 
আইরিনের আত্মাকে পাযাণের মত চেপে ধরল এই স্তন্ধত৷। 
এই বিরতি অবশ্য নেহাৎই সাময়িক । আবার শুরু হল 
যন্ত্রসঙ্গীত ৷, বিস্থৃতির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিল আইরিনের৷ 
অশাস্ত মনে৷ নৃত্যসঙ্গী তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে চলেছে 
ছন্দোময় ভিড়ের মধ্যে দিয়ে--ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে আইরিনের 
অস্বস্তি, ধীরে ধীরে ফিরে আসছে আগেকার সেই খুশিয়ালী 
ভাবটা ; 

ভালো নাচিয়ে আইরিন নয়। প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে 
হিশেব করে ভেবেচিস্তে ফেলতে হয়, হু শিয়ার থাকতে হয় প্রতি 
মুহূর্তে । কিন্তু, সন্ভ-পাওয়| স্বাধীনতার আনন্দে এখন সে 
দিশেহারা, কিসের প্রেরণায় যেন উদ্দীপ্ত | আনন্দে বেপরোয়া 
হয়ে আইরিন নাচতে লাগল । রক্তে রক্তে জেগে উঠল কী এক. 


৪৭ 


সেতুবন্ধ 

মমরধ্বনি--যে-হাতটি তাকে বেষ্টন করে ধরেছে, যে-হাত দুটি 
তাকে ছু'য়ে রয়েছে, যে-প্রসন্ন হাসি তার মুখের দিকে অপলক 
তাকিয়ে, যে-স্থরলহরী কানে এসে বাজছে__তার সবার মধ্যে 
প্রতিধ্বনি তুলেছে রক্তের ওই মর্মর, একতারে যেন বাধা হয়ে 
গিয়েছে। আনন্দের আতিশয্যে দেহটি যেন মিশিয়ে যেতে 
চাইছে হাওয়ায়। পরনের গাউনটাকে পর্যন্ত অস্বস্তিকর বলে 
সনে হয়। ইচ্ছে করে, খুলে ফেলে, ছুড়ে ফেলে সব আবরণ । 
নিরাবরণ হয়ে সমস্ত দেহ দিয়ে আক পান করে নেয় আনন্দের 
এই নেশা-বঝিমঝিম নির্যাস । একেবারে নিরাবরণ হয়ে 
ভগবানের কাছ থেকে এসেছিল যেরকম হয়ে! 

‘আইরিন! ওগো শুনছ, হল কী তোমার ?' 

চকিতে আইরিন ঘুরে দাড়াল । উত্তেজনায় ঝিকঝিক করছে 
তার চোখের তারা, শরীর টলছে। তাকাল স্বামীর চোখাচোখি । 
ও কি! অমন করে কী দেখছেন উনি ? তবে কি সে বাড়াবাড়ি 
করে ফেলেছে ? মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে? আর তার ফলে 
নিজেই বিশ্বাসঘাতকত| করে বসেছে নিজের সঙ্গে ? 

‘আমি:..আমি ঠিক বুঝতে.--ঠিক বুঝতে পারছিনে, ফ্রিজ ৷! 
আইরিন আমত| আমত! করে। আবার সেই আতঙ্ক তাকে 
'ছেকে ধরেছে। 

স্থির দৃষ্টিতে স্বামী তাকিয়ে রয়েছেন। ওই দৃষ্টির উত্তাপে 
সমস্ত অস্তরাত্ম| যেন শুকিয়ে যায়। আইরিনের মুখ কাগজের 
অত শাদা! হয়ে গেল। 


8৮ 


সেতুবন্ধ 

‘তোমার মাথা খারাপ হয়েছে! একটু থেমে স্বামী বিড় 
বিড় করে বললে । 

স্বরে সন্মেহ অনুযোগের সুর ৷ তাহলে ঠাট্টা করছেন! কিন্তু, 
এরকম ঠাট্টা কেন করলেন? ইচ্ছ| হলেও মুখ ফুটে জিজ্ঞেস 
করতে পারে না আইরিন। সাহস হয় না জিজ্ঞেস করবার । 

আর কিছু না বলে স্বামী অন্যদিকে চলে গেলেন। 
আইরিন তাকিয়ে রইল, তাকিয়ে তাকিয়ে স্বামীকে দেখতে 
লাগল । দেখতে দেখতে তার পৌরুষদীপ্ত স্বাস্থ্য আর বৃস্কন্ধের 
ওপর চোখ পড়তেই হঠাৎ থরথর করে উঠল সর্বশরীর। 
আচমকা মূখ দিয়ে তার বেরিয়ে গেল? খুনী অবিকল খুনীর 
মত দেখতে !'..-নিজের ওপর আর কোন কর্তৃত্ব নেই তার। 
তার স্বামী--তার নিজের স্বামী-:কী ভয়ঙ্কর:--কী ভয়ঙ্কর ওঁর 
চেহার!---কী ভাষণ ওঁর--- 

ফের শুরু হল যন্ত্রসঙ্গীত। সামনে এগিয়ে এল একজন, 
নৃত্যসঙ্গী হিশেবে তাকে গ্রহণ করল আইরিন। গ্রহণ করল 
যন্ত্রের মত। তাকিয়েও একবার মানুষটাকে দেখল না। 
দেখবার প্রয়োজন বোধ করল না! পা ছুটি এখন সীসের মত 
ভারী হয়ে উঠেছে। সঙ্গীতের স্থরলহরী মনে আর সাড়া 
জাগাতে পারছে না। প্রতিটি পদক্ষেপে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছে 
হৃদয়, ভেঙে পড়ছে খান খান হয়ে 

শেষ পর্যন্ত আইরিন আর সইতে পারে না। 

নৃত্যসঙ্গীর কাছ থেকে মাপ চেয়ে বিদায় নিল। তার 


8a 


সেতুবন্ধ 

বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে করতে তাকাল আড়চোখে 
হ্যা, যা ভেবেছে! ওই তে| ! ওই তো উনি দাড়িয়ে! দাড়িয়ে 
যেন তারই প্রতীক্ষা করছেন__কখন এসে আইরিন দাড়াবে তার 
পাশে। 

তারই প্রতীক্ষায় রয়েছেন, অথচ চোখের দৃষ্টিতে সেই এক 
চ্যালেঞ্জের ভাষ|। কী চান উনি? কী ভেবেছেন উনি তার 
সম্পর্কে ? কী ভাবছেন ?.-.তবে কিঁ_তবে কি উনি কিছু 


পোষাক-আশাক ঠিক করে নিল আইরিন । গুটিগুটি এসে 
দাড়াল স্বামীর পাশটিতে। নিনিমেষ ওই চাউনির সামনে স্থির 
হয়ে থাকা অসম্তব। 

‘বাড়ি যাবে?’ ভয়ে ভয়ে সে জিজ্ঞেস করল । 

LER 

কী কর্কশ স্বর! এতটুকু দরদের ছোয়া নেই ! 

স্বামী চললেন আগে আগে, তীর পায়ে পায়ে আইরিন 
ভীত সম্রস্ত সচকিত। আবার ওই পৌরুষদীপ্ত স্বাস্থ্য আর 
বৃষস্কন্ধ সম্পর্কে সে সচেতন হয়ে উঠেছে। আবার সেই আতঙ্ক 
এসে মনে হানা দিয়েছে। 

দ্রুতবেগে গাড়ি চলেছে। কথা নেই কারে! মুখে। কিন্ত, 
আতঙ্কে আইরিন অধীর হয়ে উঠেছে। সহস্র বাহু মেলে বিপদ 
এগিয়ে আসছে চারপাশ ঘিরে, সন্দেহ নেই--এ সম্পর্কে মনে 
আইরিনের কোন সন্দেহ নেই আর ! 


৫০ 


সে-রাতে আইরিন ভয়ানক খারাপ একটা স্বপ্ন দেখল $ 

কোথা থেকে ভেসে আসছে আশ্চর্য স্ুরঝঙ্কার । বড় মতন 
একটি আলোকোজ্জল ঘর। আইরিন ভেতরে ঢুকল। নানা 
ধরনের নান! বয়সের বিচিত্রবেশ বহু নরনারীর ভিড়। এগিয়ে 
এল একটি ছেলে। সামনে এসে দাড়াল ।---দেখে ভীষণ 
চেনা-চেনা লাগছে, অথচ কোথায় দেখেছে, কি করেই বা 
চিনল কিছুতেই মনে করতে পারছে ন!। ছেলেটি তাকে 
একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল! তারপর দুজনে নাচল । মন 
আইরিনের খুসিতে উচ্ছবসিত। সুরের ছোয়ায় পা দুটি এত 
হান্ধা হয়ে গিয়েছে যে মনে হয় মন্থুণ মেঝের ওপর টুক টুক করে 
লাফাচ্ছে সে ছোট একটি পাখির মত। হাওয়ায় যেন ভেসে 
বেড়ায় হুজনে৷.-নাচতে নাচতে এ-ঘর থেকে ৩ও-ঘরে যায়, 
ও-ঘর থেকে পরের ঘরে। আলোবলমল প্রতিটি ঘর। উঁচু 
ছাদ থেকে ঝুলছে শোভন সুন্দর সোনালীরঙ ঝাড়লণ্ঠন। 
ছাদ নয়-নক্ষত্রখচিত আকাশ যেন।--.*--হাসছে আইরিন 
চারপাশের আয়নায় আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে সেই হাসি ফিরে 
আসে তারই কাছে--ফের ফিরে যায় আয়নায় । চিরস্তন যেন 
এই হাসি। ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠে নাচের ছন্দ, 
বাজনার তাল দ্রুত থেকে দ্রুততর__দ্রুততম ৷---ছেলেটি এবার 
আরো কাছে ঘেযে আসছে__বুঝছে আইরিন-_আরো, আ-রো 


৫১ 


সেতুবন্ধ 
কাছে ঘেঁষে এল, আ-রো জোরে তাকে জড়িয়ে ধরল ।---তার 
উলঙ্গ বাহুটির ওপর হাত বুলোচ্ছে। আদর করছে। হাত 
বুলিয়ে বুলিয়ে সোহাগ জানাচ্ছে । সোহাগের এই উষ্ণসধুর 
মদির ছোয়ায় গ! শিরশির করে ওঠে, বেরিয়ে আসে 
গভীর একট! নিশ্বাস-আনন্দের আতিশয্যে ।---চোখে চোখে 
তাকাল । এবার আইরিন চিনতে পেরেছে _এ সেই অভিনেতা, 
কিশোরের সেই স্বপ্নের দেবতা ৷ একদিন দুর থেকে একে 
পূজো করত:। আর এখন !--নামট! উচ্চারণ করতে যাচ্ছিল, 
হঠাৎ ও তার দুই ঠোঁট চেপে ধরল রোমাঞ্চক চুম্বনে । বাহুতে 
বাহুতে বাঁধ! দুজনে, আবার ভেসে চলে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে, 
ও-ঘর থেকে পরের ঘরে--হাওয়ায় ভাসা শুকনে| ঝরাপাতার 
মত।--‘চারপাশ থেকে চার দেওয়াল যেন সরে সরে যায়, দিগন্তে 
হারায় |.-.মাথার ওপরে ছাদটিও নেই। ছাদ উঠে গিয়েছে 
আকাশে ।--ধূ ধূ প্রান্তরের_তেপান্তরের_অবাধ মুক্তি নেমে 
এসেছে। থেমে গিয়েছে সময়ের হৃদ্‌স্পন্দন। ‘-আনন্দ ! 
আনন্দ !---এত আনন্দ যেন সওয়! যায় না ! এত আনন্দের বোঝা 
বওয়| যায় না! মাটির এই পৃথিবীর সাথে নেই তার আর 
কোন সম্পর্ক ।-- স্বপ্ন ! স্বপ্ন! স্বপ্নের মত মনে হয় সবকিছু ৷ 
ব্বপ্নের মত অবাস্তব, স্বপ্নের মত অপাধিব__অলৌকিক ।--হঠাৎ 
কে যেন তার কাধে টোকা দিল। আইরিন চমকে গেল। 
স্তন্ধ হয়ে গেল স্ুরঝস্কার। দপ করে নিভে গেল আলোর 
দেয়ালি। অন্ধকার! চারপাশে অন্ধকার দেয়ালের বন্দিশালা । 


i ৫২ 


সেতুবন্ধ 
কোথায় সেই নৃত্যপরা নরনারীর| ? নেই ! কেউ কোথাও নেই। 
চোখের পলকে সব উবে গিয়েছে।--“ফিরিয়ে দে! তুই চোর! 
তুই চোর !' ওরে আমার মনের মানুযকে ফিরিয়ে দে? তীক্ষ 
স্বরে গর্জে উঠল এক নারীক১। সেই স্ত্রীালোকটি! বরফের 
মত ঠাণ্ডা হাত দিয়ে তার কবজিট! মুঠো করে ধরেছে ।--- 
“ফিরিয়ে দে ! ফিরিয়ে দে ! আমার মনের মানুষকে তুই ফিরিয়ে 
দে। চোর! তুই চোর !..-প্রাণপণে আইরিন নিজেকে মুক্ত 
করে নেবার চেষ্টা করে। বৃথা চেষ্টা ।---দুটি নারীর মধ্যে শুরু 
হয়ে যায় হাতাহাতি। কিন্তু, তার চেয়েও শক্তিশালিনী ‘ওই 
ইয়েট!’। এক হেঁচকায় তার গল! থেকে সে মুক্তোর মালাটি 
ছিনিয়ে নিল । চড়চড় করে ছিড়ে ফেলল তার অমন আুন্দর 
গাউনটি-_অ্ধেবলঙ্গ করে ছেড়ে দিল।-:-এই সময়, হঠাৎ, 
হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে লোকজন এসে ঢুকতে লাগল, চারপাশ 
থেকে, বন্তার বেগে ।--'মুহূর্তের মধ্যে লোকে লোকারণ্য ॥ 
হাজার হাজার চোখ তাকিয়ে তার দিকে, তাকিয়ে বাঁকা চোখে, 
মুখ কুঁচকিয়ে। আর, এক নাগাড়ে চিৎকার করে চলেছে: 
স্ত্রীলোকটি-‘ওগো, শোন, তোমরা সবাই শোন-_আমার 
মনের মান্তুবকে এ ছিনিয়ে নিয়েছে! এই বেবুশ্যে মাগীটা-_এই 
হারামজাদী চুরি করেছে আমার মনের মানুষকে !'.-.লুকোবার 
এওটুকু জায়গ! নেই। কোনদিকে তাকাবার সাধ্য নেই। 
চারপাশ থেকে কাটার মত উচিয়ে রয়েছে হাজার হাজার চোখ 
উদঞ্ কৌতূহলে ফেটে পড়তে চাইছে, যেন ছুয়ে দেখতে চাইছে 


৫৩ 


সেতুবন্ধ 
তার উলঙ্গ দেহটিকে।---দিশেহার। আইরিন, সাহায্যের জন্যে 
ব্যাকুলভাবে এপাশ-ওপাশ তাকাল, আঁতিপাতি করে খুজতে 
লাগল-_এতটুকু যদি মেলে আশ্রয় । হঠাৎ চোখ পড়ে যায় 
দরজার দিকে-_আলোছায়ার আঁধারীতে দাড়িয়ে রয়েছেন--- 
স্বামী! ছবির মত অবিচল। ছবির মত অপলক । পিছনে 
ডান হাত। আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল সে, এঘর ছেড়ে 
পালিয়ে গেল। কিন্ত, কোথায় পালাবে? পালিয়ে যাবে 
কোথায় ? জনতাও ছুটল পিছন পিছন। বারবার সে ঘর 
বদল করে--জনতা নাছোড়বান্দা । তাড়া! করে চলে পায়ে পায়ে। 
উন্মাদিনীর মত ছুটছে আইরিন। খশে খশে পড়ছে সাজ- 
পোষাক। সমস্ত আবরণ। শুধু দু'একটি স্যাকড়ার ফালি 
দিয়ে সে কোনমতে লজ্জা নিবারণ করছে। ছুটছে। সেই 
অবস্থাতেই । ছুটতে ছুটতে সামনে পড়ল বন্ধ একটা দরজা 
প্রচণ্ড ধাক্কায় দরজ| খুলে ফেলল--সিড়ি। হুড়মুড় করে 
নামতে লাগল সিড়ি দিয়ে।---যাক, এবার সে নিরাপদ 
কিন্তু---কিন্তু ওই তে| সি'ড়ির গোড়ায় দাড়িয়ে সে--সেই কুংসিৎ 
স্ত্রীলোকট!। পরনে সেই নোংর! পোষাক। সেই কড়াপড় 
তামাটে হাত। দেখেই অন্যদিকে ছুটতে শুরু করল-_তাড়া- 
খাওয়! ভীত হরিণীর মত--ছুটে চলল ।---আইরিন ছুটছে, ও-ও 
ছুটছে পিছনে পিছনে। এ-রাস্ত৷ থেকে ও-রাস্তায়, ও-রাস্ত| 
থেকে সে-রাস্তায়। এই রাস্তারও যেন শেষ নেই, শেষ নেই 
এই ছোটারও। দু’পাশের আলোগুলি যেন মিট মিট ফরে 


৫৪ 


সেতুবন্ধ 
হাসছে, হাসছে তাকে দেখে। পিছনে শোন! যাচ্ছে স্ত্রীলোকটির 
সস্তা দামের জুতোর থপ থপ শব্দ-_পিছনে। তবু, সামনের 
দিকে তাকালেই যেন ওর দেখতে পায় হিংস্র মুখখান|। 
দু'পাশের প্রতিটি বাড়ির আনাচে কানাচে যেন ওৎ পেতে রয়েছে 
ওই স্ত্রীলোকটা-- একাই একশ হয়ে ছড়িয়ে সর্বত্র । চারপাশ 
থেকে তাকে তাড়! করছে। তাড়া করে নিয়ে চলেছে। যতক্ষণ 
না হাটু ভেঙে পড়ে, মুখ থুবড়ে সে পড়ে যায়_-তাড়া করে নিয়ে 
চলবে । --ছুটতে ছুটতে আইরিন বাড়ির দরজায় এসে পৌছল। 
হুমড়ি খেয়ে পড়ল দরজার ওপর । সশব্দে খুলে গেল দরজা, 
সে ঢুকে গেল ভেতরে ৷ সামনে দাড়িয়ে স্বামী! হাতে ছুরি। 
আগুন দুই চোখে। তাকালেন স্ত্রীর দিকে। ‘কোথায় ছিলে 
এতক্ষণ ?? জিন্ঞেস করলেন নিষ্প্রাণ স্বরে। ‘কোথাও ন? 
নিজের স্বর নিজের কানেই অচেনা হয়েই বাজে, আর সঙ্গে সঙ্গে 
বেজে ওঠে তীক্ষ তীত্র অট্টহাসি। ‘আমি দেখেছি। ওই 
মাগীটাকে আমি দেখে ফেলেছি। হাঃ হাঃ হাঃ!’ স্বামী হাত 
তুললেন, ঝিলিক দিয়ে উঠল ছুরির শাণিত ফল!। ব্ঁচাও ! 
বাঁচাও !' 

আর্তস্বরে আইরিন চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে কোথাও আছে৷ 
বাঁচাও-বাঁচাও !’ 

ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল আইরিন। চোখ 
কচলিয়ে সামনের দিকে তাকাল--স্বামী! একৃষ্টে তাকিয়ে 
তারই দিকে। ঘরে আলো জ্বলছে। 


৫৫ 


সেতুবন্ধ 

সে তাহলে বাড়িতেই রয়েছে! এ সবই তাহলে স্বপ্ন ! 

স্বপ্ন! যাক 

কিন্ত 

কিন্ত স্বামী তার বিছানার একপাশে বসে কেন? সেকি 
অমুস্থ যে অমন করে তাকিয়ে রয়েছেন তার দিকে? আলোই 
বা জ্ালল কে? উনি? কেন উনি কথা বলছেন না? কেন 
পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে গিয়েছেন? কেন? কেন? 

আতঙ্কে গা! শিরশির করে ওঠে। মুখ তোলবার সাহস 
হয় না, সম্ভপণে হাতের দিকে তাকাল আইরিন, আড়চোখে । 
না, হাতে ছুরি নেই ! 

আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে ঘুমের কুয়াশা, ফিরে আসছে 
স্বাভাবিক বোধশক্তি। স্বপ্ন ! 

এতক্ষণ ধরে য! য৷ দেখেছে, সব স্বপ্ন, স্বপ্ন দেখেই ভয় পেয়ে 
গয়েছিল, সাহায্যের জন্যে আর্তনাদ করে উঠেছিল। তার 
আর্তনাদেই স্বামীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাই উনি ছুটে এসেছেন। 
কিন্তু, অমন করে তাকিয়ে তাকিয়ে তার মুখে উনিকী 
দেখছেন? কা উনি বলতে চান ? 

‘ আইরিন হাসবার চেষ্টা করল । 

‘কি গো, অমন মুখ গোমড়া করে তাকিয়ে আছ কেন? 
জানো, ভারা বিচ্ছিরি একটা দুঃস্বপ্ন দেখে 

ঘুমের ঘোরে তুমি কাদছিলে। পাশের ঘর থেকে শুনে 
আমি 


৫৬ 


Et. TEL 


সেতুবন্ধ 

কাদছিলাম ? সর্বনাশ ! বেফাস কিছু বলে ফেলিনি তে? 
উনি কি কিছু শুনেছেন? শুনলে, কী শুনেছেন ?চকিতে 
ভাবনাগুলো আইরিনের মাথায় খেলে যায়। স্বামীর চোখে 
চোখে তাকাতে সে ভরসা পায় না। 

স্বামী অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর । তেমনি নিনিমেষ চোখে 
তাকিয়ে রইলেন স্ত্রীর দিকে। 

একটু পরে বললেন, ‘তোমার কি হয়েছে বল তো, রিনা? 
বুঝতে পারছি, কিছু-একট! ঘটেছে__হু', নিশ্চয় । গত তিনচার 
দিন ধরে তুমি যেন কেমনতর হয়ে গেছ। মনে হয়, ভেতরে 
ভেতরে জ্ররজারি হয়েছে_সব সময় তাই উত্তেজিত উদ্ভ্রান্ত 
হয়ে থাক । সব সময় ছটফট করছ--ঘুমের ঘোরেও...{' 

ফের হেসে ব্যাপারট! আইরিন উড়িয়ে দেবার চেষ্ট'। করল । 

‘না না, হাসি নয়!’ স্বামী বলতে লাগলেন, ‘আমার কাছ 
থেকে কিছু লুকিও না, লক্ষ্মিট ! মন খারাপ হয়েছে, হ্যা, 
সোন? কেউ তোমায় ব্যথা দিয়েছে? বলে? তুমি যে 
সত্যিই বদলে গিয়েছ বাড়ির সববরাই সেট! লক্ষ্য করেছে। 
লক্ষ্মিটি, বল না গো--কি হয়েছে তোমার ? আমায় তুমি বিশ্বাস 
করো না? ওগো 

স্বামী আরে| কাছে ঘেঁষে এলেন। 

আইরিন অন্তুভব করে, তার নগ্ন বাহুতে স্বামীর সোহাগ- 
পরশ-তার বাহুতে হাঁত বুলিয়ে বুলিয়ে তাকে আদর করছেন, 
অভয় দিচ্ছেন। চোখে ফুটে উঠেছে সেহসুকোমল দৃষ্টি । 


8 ৫৭ 


সেতুবন্ধ 
বুকটা! আইরিনের মোচড় দিয়ে ওঠে। সাধ জাগে, দুহাতে 
ওঁর গলা জড়িয়ে ধরে। স্বামীর প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে অকপটে 
বলে যায় সব কথা । স-ব অপরাধ স্বীকার করে নিজের মুখে 
এখ খুনি, এই মুহূর্তে । ভেতরে ভেতরে সে দঞ্ধে দঞ্ধে মরছে উনি 
টের পেয়ে গিয়েছেন__এখন আর কিসের লজ্জা, কিসের ভয়। 
কিন্তু, বড় উজ্জল ওই ইলেকটি,কের আলো-_বড় নির্মম ওর 
উজ্জ্বলতা । 

এত আলোয় মুখ তুলে সে চাইতে পারবে না। 

‘কেন তুমি মিছে ভেবে মরছ, ফ্রিজ! ফের জোর করে 
হাসবার চেষ্টা করল আইরিন। “এ কিছু নয়। এক্ষুনি ঠিক 
হয়ে যাবে_দেখে'-_-বলতে বলতে কি ভেবে সৰ্বাঙ্গ তার 
শিরশিরিয়ে ওঠে। 

আলিঙ্গনের জন্য এগিয়ে এসেছিল যে-হাতখানা, চোখের 
পলকে সেটা সরে গেল। ছাইয়ের মত শাদা হয়ে গেল স্বামীর 
মুখখানি । চিন্তার রেখা পড়ল কপালে, ভুরু ছুটি এল 
কুঁচকিয়ে । আস্তে আস্তে তিনি উঠে দাড়ালেন। 

বললেন, ‘জানিনে কেন--তবু-_কদিন ধরে কেবলি মনে 
হচ্ছে, আমায় যেন তুমি কিছু বলতে চাও ।---কেন-যে মনে 
হচ্ছে ! তুমি আর আমি:--শুধু তুমি আর আমি জড়িত এমন 


সেতুবন্ধ 

হায়রে ! আইরিন ভাবে, ছোট্ট দুটি শব্দে কী সাস্তনা লুকিয়ে 
রয়েছে-__ক্ষমা করে !! একবার যদি মুখ ফুটে বলে-সাথে 
সাথে সব সমস্তার সমাধান হয়ে যাবে। অবসান হয়ে যাবে 
অমানুষিক এই মানসিক যন্ত্রণার । আর একটি প্রশ্নও স্বামী 
তাহলে করবেন না। কোনও দিনও না। ‘ওগো, ক্ষমা করো! 
কী মধুক্ষরা এই কটি শব্দ ।---ক্ষমা করো---ক্ষম| করে!'.-- 

কিন্ত, বড় নিচুর ওই আলে! 

যদি অন্ধকার তাকে ঘিরে থাকত, যদি কেউ কারো! মুখ না 
দেখতে পেত-_অনায়াসে সে এখন স্বীকার করতে পারত সব 
অপরাধ । কিন্তু, ওই হিংস্র-প্রখথর আলে! শুষে নিয়েছে তার 
সবটুকু সাহস । সবটুকু সাহস আর সমস্ত শক্তি । 

‘তোমার তাহলে কিছু---একেবারে কিছুই আমায় বলবার 
নেই ? ভেবে দেখ:-” আস্তে আস্তে স্বামী বললেন । 

মমতায় নিবিড় তীর কণ্ঠস্বর । শুনে স্বীকারোক্তির বড় লোভ 
জাগে আঁইরিনের। ভাবে, বলে ফেলে সব কথা৷ এমন স্থুযোগ 
আর আসবে না।-- 

শুধু, ওই হৃদয়হনন আলোটা যদি না জলত অমন করে! :. 

কূধ ঝাকানি দিয়ে আইরিন বলল, ‘কী তুমি বলতে চাও 
বুঝিনে বাপু !! বলে সশব্দে হেসে উঠল । কৃত্রিম হাসি, নিজের 
হানি শুনে নিজেই আঁৎকে ওঠে। তবু বজায় রাখে মুখের 
হাসিটুকু | ‘কি-একট! দুঃস্বপ্ন দেখেছি না দেখেছি-_অমনি 
তুমি ধরে নিলে আমার বুঝি কোন গোপন রহস্ত রয়েছে। 


৫৯ 


সেতুবন্ধ 

আশ্চর্য ! কে জানে, হয়ত ভাবছ আমার একটি প্রেমিকও 
রয়েছে !' 

শেষ বথাগুলি বলার সাথে সাথে ঝনঝন করে ওঠে মস্তিক্ধ। 
তাড়াতাড়ি আইরিন মুখ ফিরিয়ে তাকাল অন্যদিকে ৷ 

‘বেশ। তবে এবার ঘুমোও ৷’ কাটা কাটা স্বরে স্বামী 
বললেন। কথার স্থুরে কোমলতার লেশমাত্র নেই । আইরিনকে 
যেন তিনি হুমকি দিলেন। 

আলো নিভিয়ে দিয়ে স্বামী চলে যাচ্ছেন, দরজায় তীর 
অপস্থয়মান অবয়ব-_দুই চোখ বিস্ফারিত করে আইরিন তাকিয়ে 
_প্রেতের মত তিনি নিঃশব্দে নিক্কান্ত হলেন ঘর থেকে। 
বাইরে থেকে দরজার পাট দুটি টেনে বন্ধ করছেন-_আইরিনের 
মনে হয়, তাকে যেন কফিনে পুরে তার ডালাটা উনি এবার 
আটকে দিচ্ছেন। পৃথিবীতে যেন থেমে গিয়েছে প্রাণের 
স্পন্দন, ফাঁপ! হয়ে গিয়েছে শরীরটি তার-_বুকটা কেবল 
ধড়াস ধড়াস করছে ভয়ানকভাবে। যন্ত্রণ৷ ! শুধুই যন্ত্রণা ! 
বড় যন্ত্রণ। ! যন্ত্রণায় যেন ছিড়েখু'ড়ে যাচ্ছে প্রতিটি শিরা- 
উপশির।। 


পরের দিন। 

স্বামী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে আইরিন জলখাবার খেতে 
বসেছে। 

দুই ভাইবোনে এতক্ষণ ঝগড়া করে শাস্ত হয়েছে এইমাত্র ৷ 


৬৪ 


গেতুবন্ধ 


দাসী একটি চিঠি নিয়ে এল । 

‘আপনার চিঠি গিন্নিমা। এক্ষুনি জবাব চাইছে 

খাম ছিড়ে ফেলে আইরিন চিঠিট! বার করল। সংক্ষিপ্ত 
এক লাইন চিঠি? 'দয়া করিয়|৷ পত্রবাহকের হাতে একশত 
ক্রাউন দিয়! দিউন ! 

মুহূর্তে মুখখান| তার ফ্যাকাশে হয়ে যায়। 

চিঠিতে কারে! স্বাক্ষর নেই। ঠিকানা! বা তারিখও না। 
তবু, কে যে লিখেছে বোঝা মোটেই দুদ্কর নয়। মার্কামার! 
হৃত্তাক্ষর। 

টাকা আনবার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে আইরিন নিজের ঘরে চলে 
গেল 

ক্যাশবাক্সের চাবিটা কোথায় রেখেছে তাড়াতাড়িতে মনে 
পড়ে ন|। একবার এ-ড্রয়ার হাতড়ায়, একবার ও-ডরয়ার | অনেক 
খোজাখু'জি শেষে পাওয়| গেল চাবি। কাপা-কাপ৷ হাতে সে 
বের করে নিল একতাড়া নোট। তারপর নোটগুলি একটি 
খামে ভরে দাসীর হাতে সেটা দিয়ে দিল। 

কাজগুলো করল আইরিন নিশিতে-পাওয়! মানুষের মত। 
যন্ত্রের মত পর পর করে গেল সবকিছু-_বারেকের জন্যেও মনে 
কোন দ্বিধা জাগল ন! ৷ মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ফিরে এসে 
বসল খাবার টেবিলে। 

এবার জাগল অস্বস্তি । কথা নেই কারে! মুখে। পাথরের 
মত গুরুভার এই স্তন্ধতা বুকটাকে যেন তার দলে-পিষে দিচ্ছে। 


৬১ 


সেতুবন্ধ 

ঠাট্টাতামাশার মধ্যে দিয়ে এই অস্বস্তিকর আবহাওয়াটা 
ভেঙে দেবার জন্যে আইরিন সোজ! হয়ে বসেছিল, হঠাৎ তার 
চোখ পড়ে যায় সামনের দিকে-_টেবিলের ওপর, তার প্লেটের 
ঠিক পাশেই, খোল! পড়ে রয়েছে চিরকুটটা। 

তাকালেই চোখে পড়ে! 

ইচ্ছে করলেই পড়তে পারে যে-কেউ! 

আতঙ্কে হিম হয়ে'গেল আইরিন । 


চোরের মত অতি ভয়ে ভয়ে চিরকুটটায় হাত চাপ! দিল, 
সম্ভর্পণে সেটা মুঠে৷ করে ধরে সরিয়ে ফেলল হাতখানি। তারপর 


তাকাল স্বামীর দিকে। তীত্র অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে স্বামী তাকিয়ে 
রয়েছেন তারই দিকে। বিদ্বেষ আর জালা ফুটে বেরুচ্ছে তার 
চাউনিতে ৷ 

স্বামীর এমন চাউনি আইরিন জীবনে কোনদিন দেখেনি। 
তীক্ষ শলাকা! হয়ে ওই চাউনি যেন তার মর্মমূলে গিয়ে বি'ধছে। 
কি করে এই আক্রমণের হাত থেকে আত্মরক্ষা করবে? কাল 
সন্ধ্যার সেই আনন্দের আসরেও এমনি মর্মভেদী দৃষ্টিতে উনি 
তাকিয়ে ছিলেন-অবিকল এমনি বিদ্বেষ আর জালা ফুটে 
বেরিয়েছিল ওর চাউনিতে ৷ 

ক্ষুরধার খড়োর মত তার ঘুমের শিয়রে রাতভোর উদ্যত হয়ে 
ছিল এই চাউনি-_হিংঅর ভয়ঙ্কর এই দৃষ্টিপাত । 

কিছু-একট! বলা দরকার। এই স্ত্ধতাকে ভাঙা দরকার । 
আইরিন চেষ্ট| করে। কিন্তু, প্রাণপণ চেষ্টাতেও গলা দিয়ে তার 


৬২ 


সেতুবন্ধ 

স্বর বেরোয় না। কি বলবে::-কি বলা উচিত'.-কি করে 
বলবে-_ভেবে ভেবে সারা হয়ে যায়। 

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে, বহুদিন-ভুলে-যাওয়া একটি 
ঘটনার কথা! স্বামীই একদিন বলেছিলেন। এক মামলায় 
প্রতিবাদী পক্ষে ছিলেন স্বামী । সরকারি উকিল সেই মামলায় 
কিভাবে এক অবাধ্য সাক্ষীকে বেকায়দায় ফেলে শায়েস্তা! 
করেছিলেন--উনি এসে সেটা গল্প করেন। সরকারি উকিল এমন 
ভাব দেখাচ্ছিলেন যেন চোখে তিনি ভাল দেখতে পান না। 
তাই টেবিলের ওপর ছড়ানো নথিপত্রগুলির ওপর হুমড়ি খেয়ে 
পড়েছিলেন। ভ্রক্ষেপ নেই আর কোনদিকে! কিন্তু, সওয়াল 
গুরু হওয়| মাত্র চোখ তুললেন আচমকা, এমন অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে 
চাইলেন সাক্ষীর দিকে যে তার মিথ্যে কথার জাল মুহূর্তে কুটি 
কুটি হয়ে ছিড়ে গেল। লোকটা ভাববার ফুরসংটুকু পর্যন্ত পেল 
না-_হড়বড় করে বলে ফেলল সত্যি ঘটনাটা । 

স্বামীও কি আজ সেই কৌশল প্রয়োগ করছেন তার ওপর ? 

আইরিন জানে, ব্যারিষ্টার হিশেবে উনি শুধু আইন নিয়েই 
মাথা খঘামান না-_মনস্তত বিশ্লেষণও ওঁর কার্যক্রমের অচ্ছেষ্য 
একটা অঙ্গ । সাধারণ লোকে যেটা ভুলেও ভাবে না, ভাবতেও 
পারে নাঁতারই স্কুত্র, ধরে উনি অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে ' 
তোলেন। 

তাই তো এত ভয় ওঁকে । ভালোভাবে ওঁকে জানে বলেই 
না ওঁর এই নির্বাক দৃষ্টির সামনে আতঙ্কে সে দিশেহার! হয়ে 


৬৩ 


সেতুবন্ধ 

যাচ্ছে। পাক৷ জুয়াড়ী যেমন তন্ময় হয়ে জুয়া খেলে-_অপরাধের 
সন্ধান পেলে উনিও তেমনি নাওয়া-খাওয়া ভুলে যান। অপরাধের 
স্থত্র ধরে তার উদ্দেশ্য, তার হেতু, তার খুটিনাটি বিবরণ ইত্যাদি 
বার করবার জন্যে উঠে-পড়ে লাগেন। মেতে ওঠেন জটিল এক 
মনস্তাত্বিক খেলায় । 

বড় মারাত্মক এই খেলা! 

সঙ্গে সঙ্গে পুরে! মানুষটারই যেন ঘটে যায় আমুল 
পরিবর্তন । জলন্ত এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয় যেন। উত্তেজনা 
যখন চরমে পৌছোয়, ক্ষুধা-তৃষ্ণার বোধটুকুও থাকে না। মুখের 
কাছে এগিয়ে দিলেও কিছু খেতে পারেন ন|। সব সময় 
আত্মগত। হয়ত মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বসলেন 
কোন ঘোরালে!| সমস্তার সমাধান করতে। পাইপ টানছেন 
তে! টানছেনই ৷ বিশেষ করে, মামলার আগের কদিন_ মুহূর্তের 
জন্যেও পাইপ নামান না। কথাবার্তা একদম বলেন না--সব 
শক্তি মুলতুবি করে রাখেন, শক্তি সঞ্চয় করেন-_বাদী বা বিবাদী 
যে পক্ষেই দাড়ান, আদালতে দাড়িয়ে সওয়ালের জন্যে, নিজের 
কর্তব্য যথোচিতভাবে পালন করবার জন্যে প্রস্তুত হন। 

আইরিন একদিন গিয়েছিল আদালতে। গিয়েছিল 
স্বামীর সওয়াল-জবাব শুনতে। স্বামী সেবার বাদীপক্ষে 
দাড়িয়েছিলেন। 

সে-স্মৃতি মনে পড়লে আজে হৃংকম্প জাগে। 

সে কী ভয়ঙ্কর চাউনি ওঁর! গলার স্বরে সে কী প্রচণ্ড 


৬৪ 


সেতুবন্ধ 
আবেগ! কী নিষ্ঠুরভাবেই বিপক্ষ সাক্ষীদের সমস্ত যুক্তিতর্ককে 
ধূলিসাৎ করে দিলেন! 

অমন শান্ত সংযত মানুষট! আঁদালতে দাড়িয়ে কিরকম বদলে 
গিয়েছিলেন !--ভাবা যায় না। 

তাঁরপর থেকে আইরিন প্রতিজ্ঞা করেছে, মরে গেলেও আর 
কক্ষনো সে ও-মুখো হচ্ছে না। 

কিন্তু আজ ? আজ সে-_ওঁরই স্ত্রী হয়ে সে আজ দাড়িয়েছে 
আসামীর কাঠগড়ায়! দাড়িয়েছে ওঁর ওই অন্তর্ভেদী দৃষ্টির 
সামনে! oeeee 

মুখ ফুটে আইরিন কিছু হয়ত বলতে যাচ্ছিল, জোর করে 
ছুই ঠোঁট চেপে চুপচাপ বসে রইল। না, কথা বলা এখন ঠিক 
হবে না। 

আবার, চুপচাপ এভাবে বসে থাকার পরিণাম ভেবেও সে 
বিভ্রান্ত হয়ে যায়। 

কথ! বললেও বিপদ, এরকম মুখ বুজে থাকলেও হবে হিতে 
বিপরীত ! j ! 

কপাল ভালো, খাওয়ার পাট এবার চুকল। সঙ্গে সঙ্গে 
ছেলেমেয়ের৷ হৈচৈ করতে করতে বেরিয়ে গেল। বাইরে গিয়ে 
শুরু করে দিল হুটোপাটি। গভর্নেস তাদের থামাবার জন্যে 
ধমকাতে লাগল । 

আইরিনও উঠে দাড়াল । কোনদিকে ন! তাকিয়ে চলে গেল 
তার পড়বার ঘরে। 


৬৫ 


সেতুবন্ধ 


এখন সে এক! ৷ পকেট থেকে বার করল সেই চিরকুটটি ৷ 
সামান্য চিরকুট তে এ নয়_তার মৃত্যু-পরোয়ানা ! আবার 
পড়ল ঃ ‘য়! করিয়| পত্রবাহকের হাতে একশত ক্রাউন দিয়া 
দিউন ৷’ 

রাগে সর্বাঙ্গ জলে যায়। 

চিরকুটট! দল! পাকিয়ে মারবেলের মত শক্ত করে আইরিন 
ছুড়ে ফেলল কাগজ-ফেলার ঝুঁড়িতে। কিন্ত--সর্বনাশ ! 
ওভাবে ওটাকে ওখানে তো ফেলে দেওয়া যায় ন|। তাড়াতাড়ি 
উবু হয়ে বসে কাগজপত্র ঘেটে ফের সেটাকে খুজে বার করল । 
এবার ফেলে দিল অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে । 

আগুনের লোলুপ শিখ! লকলকে জিব বের করে এগিয়ে 
আসে-_ওই ঘৃণ্য জিনিসট! কুঁকড়ে যায় ধীরে ধীরে। বিবর্ণ 
হতে হতে পরিণত হয় ভস্মে । 

আগু বিপদের হাত থেকে রেহাই পেয়ে ঘর থেকে বেরোবার 
জন্যে পিছন ফিরল আইরিন। 

বেরনো কিন্তু হল না। বারান্দায় কার পদশব্দ এগিয়ে 
আসছে। 

আর কার! 

দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছেন! অগ্নিকুণ্ডের তাতে একেই 
মুখট! তার জ্বলে যাচ্ছে, তার ওপর সামনে দাড়িয়ে স্বামী! ধরা 
পড়ে গিয়েছে হাতেনাতে ৷ কান দিয়ে যেন আগুন ছুটতে থাকে। 
অগ্নিকুণ্ডের ঢাকনিট! এখনো খোলা! রয়েছে, শরীর দিয়ে 


৬৬ 


সেতুবন্ধ 


ওটাকে আড়াল করে দীড়াবার চেষ্টা করে। পা টলমল করে 
আইরিনের । L 

সিগার ধরাবার জন্যে স্বামী দেশলাই জআলালেন। 
দেশলাইয়ের ক্ষণিক আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে 
আইরিনের মনে হয় উত্তেজনায় ওর নাকের বাশি যেন কাপছে 
থরথর করে। অর্থাৎ, উনি ভয়ানক রেগে গিয়েছেন-__স্পষ্ট 
বুঝল ৷ 

তবু স্বামী নরম চোখেই তাকালেন। শান্ত স্বরে বললেন, 
‘তোমায় একটা কথা বলতে এলাম__শোনে|, তোমার ব্যক্তিগত 
চিঠিপত্র আমায় যদি না দেখাতে চাও, দেখিও না। আমি 
কোনরকম আপত্তি করব ন!। তুমি যদি খুশি হও_তোমার 
গোপন কথ আমায় না জানাতেও পারে|। সে-বিষয়ে পুরে 
স্বাধীনতা তোমার রয়েছে 

আড়ষ্ট হয়ে রইল আইরিন। ঠোঁট দুটি যেন জুড়ে গিয়েছে। 
চোখ তুলে চাইবার সাহস নেই। 

দু’ এক সেকেণ্ড অপেক্ষ! করলেন স্বামী । তারপর ভক করে 
সিগারের ধোয়! ছাড়লেন-__ধে'য়াটি! যেন ছুঁড়ে মারলেন: 
আইরিনের মুখ লক্ষ্য করে। 

তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। 


৬৭ 


ভাগনার-গৃহিনী আর ভাবতে পারে না। আর সে ভাবতে 
চায় নী। 

এখন সে শুধু চায় শান্তি । শুধু চায় কোনমতে এই জীবনের 
বোঝা বয়ে চলতে । 

অসহা হয়ে উঠছে এই বাড়ি । এক দণ্ড আর এখানে মন 
টেকে না। ইচ্ছে করে সব সময় বান্ধবীদের সাথে সাথে 
কাটায়_এর-ওর বাড়ি ঘুরে বেড়ায় । নইলে আতঙ্কে সে উন্মাদ 
হয়ে যাবে। 

একশ ক্রাউনের ঘুযে কদিন বাঁচবে ওর হাত এড়িয়ে ? 

খানিকটা! বেড়িয়ে এলে হয়তো ভাল লাগবে। তাছাড়া, 
কিছু কেনাকাটারও দরকার রয়েছে। বাইরে গেলে কিছুক্ষণের 
জন্তে মুক্তি পাবে এই সংসারের বন্দিশাল! থেকে। 

বন্দিশালা ছাড়া কি এট! ? সব সময় সকলের চোখ তার 
ওপর, তার অস্বাভাবিক চালচলন অবাক হয়ে দেখছে সবাই 
আইরিন তা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে। 

বাড়ি থেকে বেরোবার জন্যে আইরিন প্রস্তুত হল । 

বড় বিচিত্র তার এই প্রস্তুতি । সদর দরজার কাছে' দাড়িয়ে 
প্রথমে তাকাল রাস্তার, তারপর মানুষের মিছিলের দিকে। 
তাকিয়ে চোখ বুজল-_সাতারু যেন স্প্রিংবোর্ড থেকে জলে 
ঝাপ দেবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। একবার পায়ের তলায় 


৬৮ 


সেতুবন্ধ 
রাজপথের স্পর্শ পেলে আর ভয় নেই__জনস্সোতে ভেসে 
চলে যাবে অনায়াসে । সত্যিকারের ভদ্রমহিলার মত মাথা 
উঁচু করে চলতে পারবে-_আশেপাশে কোনদিকে দৃকপাত 
না করে।' 

রাস্তায় নেমে আজ সে চলতে লাগল মাথা হেঁট করে_পাছে 
চোখাচোখি হয়ে যায় সেই ভয়ঙ্কর একজোড়৷ চোখের সাথে।:- 
আজও যদি ওর পিছু নেয়, আইরিন গ্রাহও করবে ন! ।---তবু, 
থেকে থেকে কেন-যে মনটা আশঙ্কায় দুলে ওঠে! কারে 
মুখোমুখি পড়ে গেলেই ধক করে উঠছে বুকটা! পাশে খুট করে 
কোন শব্দ হওয়! মাত্র চমকে যাচ্ছে! 

পেছনের প্রত্যেকটি পদশব্দ শক্তিশেল হয়ে বুকে বাজে। 
চারদিকে যেন তাঁর মানুষ নয়, প্রেতের সঞ্চরণ। কোন 
বান্ধৰীর বাড়ি গিয়ে না পৌছনে! পর্যন্ত ভালে! করে নিশ্বাস 
নিতেও পারবে না আইরিন। 

এক ভদ্রলোক টুপি খুলে নমস্কার জানালেন । তার দিকে 
তাকিয়ে আইরিন খুশি হল। ভদ্রলোক তাদের পারিবারিক 
বন্ধু! অত্যন্ত অমায়িক, তবে কথা একটু বেশি বলেন_বাচাল 
প্রকৃতির মানুষ যাকে বলে। সাধারণত একে আইরিন এড়িয়ে 
চলে । কেননা সুযোগ পাওয়ামাত্র নিজের যাবতীয় দুঃখদুর্দশার 
বিশদ বর্ণনায় ভদ্রলোক মশগুল হয়ে পড়েন। আজ কিন্তু 
আইরিন এর সাহচর্য পেলে বর্তে যেত। ইশ, বড্ড ভুল হয়ে 
গিয়েছে! কেন ওঁকে যেতে দিল ? অভ্যাসবশে কিন্তু, উনি 


৬৯ 


সেতুবন্ধ 

পাশে থাকলে ওই র্যাকমেলারটা যে কাছে ঘেষতে পারত না_ 
এটা কেন সে খেয়াল করেনি! ফিরে ডাকবে? 

পাশ ফিরে ভদ্রলোককে ডাকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ নজরে 
পড়ল-হনহন করে একজন এগিয়ে আসছে তারই দিকে। 
কে আসছে দেখবার অবসর নেই, সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে 
আইরিন উধখবাসে এগোতে লাগল | অন্ধের মত এগিয়ে চলল । 

আবার ও পিছু নিয়েছে! 

একটু পরেই কাধের ওপর ওর কুংসিৎ হাতটা এসে পড়বে! 

মনে হতেই কাধ দুটো শিরশির করে ওঠে। সারা শরীরে 
বয়ে যায় আতঙ্কের শিরশিরানি। 

আসছে ! আসছে ! ক্রমেই ও এগিয়ে আসছে-_কাছে এসে 
পড়ছে! 

কি করে পালাবে আইরিন ? পালাবে কোথায় ? ঠক ঠক 
করছে তার হাঁটু ছুটি, অসম্ভব আর পথ চলা । 

ওই এল ! এই বুঝি তার কাধে হাত রাখল ! আরে! কাছে 
এসে পড়েছে। একেবারে পিছনে! গায়ে গায়ে ! এবার 

তার কানে এসে বাজল নরম একটি কণ্ঠস্বর। নরম অথচ 
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্পষ্ট উচ্চারিত হল তার নাম_ 

‘আইরিন? 

কিন্তু না, যে-কণঠশ্বর সে আশঙ্কা করছিল তা তৌ নয়। 
চকিতে ঘুরে দাড়াল আইরিন-_হুমড়ি খেয়ে তার ওপর পড়তে 
কোনমতে সামলে নিল কাল” ক্রস্টম্যান। 


৭০ 


সেতুবন্ধ 

আবেগের উত্তেজনায় কালে'র মুখখানা শাদ| হয়ে গিয়েছে। 
কিন্তু এমন নিরাসক্ত নিস্পৃহ চোখে আইরিন তার দিকে তাকাল 
যে লজ্জায় সে থতমত খেয়ে গেল। তবু করমর্দনের জন্তে 
বাড়িয়ে দিল হাতখান৷ । আইরিন চেয়েও দেখল না। হতাশ 
হয়ে হাত বেচারা নেতিয়ে পড়ল আস্তে আস্তে । 

এখানে, এখন, এভাবে কালের সাথে দেখা হয়ে যাবে 
আইরিন কল্পনাও করতে পারেনি । সে-ও বিমুঢ় হয়ে গিয়েছে। 
বেশ কয়েক সেকেণ্ড পরে তার খেয়াল হয়--একি ! অমন মুগ্ধ 
চোখে ওর দিকে সে তাকিয়ে রয়েছে কেন! 

গত কয়েকদিন ধরে মুহুর্তের জন্যেও প্রেমিকের কথ! তাঁর 
মনে হয় নি। সব সময় তার মন জুড়ে ছিল আতঙ্ক_প্রেম বা 
প্রেমিকের প্রসঙ্গ ভাববার অবসর ছিল ন|। কিন্ত এখন ওর 
বিবর্ণ মুখের দিকে, জিজ্ঞাসায়িত দুই চোখের দিকে তাকিয়ে 
ক্ষেপে যায় সে। বুকের মধ্যে উখলে ওঠে ক্রোধের জোয়ার । 
ঠোঁটি ছুটি এমনভাবে থরথর করতে থাকে যে স্পষ্ট করে একটি 
শব্দও উচ্চারণ করতে পারে না। 

তার চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে গেল কার্ল'। 

‘আইরিন, কি ব্যা-ব্যা-ব্যাপার বল তো?” কথা বলতে 
গিয়ে কাল” তোতলাতে থাকে। 

তীব্ৰ চোখে তাকাল আইরিন। 

‘আ-আমি কি কোন অন্যায় করেছি ?' মিন মিন করে 
কাল বলল । 


৭১ 


সেতুবন্ধ 


‘অন্তায় করেছি! ফেটে পড়ল আইরিন। না না 
অন্তায় তুমি করবে কেন-_তুমি কি অন্যায় করতে পার!’ বিদ্রপ 
করে বলল, তুমি যা করো স-ব ভালো ভালো কাজ। এমন 
সব ভালো কাজ তুমি করো যে_’ 

হু হয়ে গেল কার্ল । 

‘তুমি:‘-তুমি কি বলছ ?:--আমি--” 

‘থাক! রাস্তায় আর নাটক করে| না! গম্ভীর স্বরে 
আইরিন বলল, ‘তোমার কীঁদুনি আমি শুনতে চাইনে। তোমায় 
আমি ভাল করেই চিনেছি। দেখো-_ধারেকাছেই হয়ত 
তোমার প্রাণের উনি ওং পেতে রয়েছেন। একজন চলে গেলেই 
আরেকজন এসে হামলা_' 

‘কার কথ তুমি বলছ ?' 

আইরিনের ইচ্ছে হল, ঠাস করে এক চড় কথিয়ে দেয় ওর 
গালে। ভড়ং কত! যেন কিচ্ছুটি জানেন না! উজবুকের 
মত কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখ না! 

ছেলেটাকে দেখে সর্বদেহ তার দ্বণায়.রী রী করে ওঠে 
এতখানি ঘ্বণা জীবনে বোধ হয় কাকেও সে করেনি। 

‘আইরিন:--আ-আ-আইরিন’_বিভ্রান্ত কাল, কথা তার 
কেবলি জড়িয়ে জড়িয়ে যায়, ‘কেন তুমি আমার ওপর রাগ 
করছ, আইরিন! আমি কী দোষ করলাম! হঠাৎ তুমি ঠিক 
করলে, আমার সাথে আর দেখা করবেনা---কেন, কি বৃত্তান্ত 
ভগবান জানেন:-‘অথচ এদিকে আমি দিন রাত তোমার পথ 


৭২ 


সেতুবন্ধ 
চেয়ে বসে থাকি---আজ সকাল থেকে তোমাদের বাড়ির কাছে 
দাড়িয়ে আছি, শুধু দুটো কথ!’ 


‘ভঁযা ! আমাদের বাড়ির কাছে দাড়িয়ে ছিলে! তুমিও ॥ 
তুমিও !! রাগে মুখ দিয়ে কথা সরে না আইরিনের। কী 
শয়তান! ওর মুখের ওপর প্রাণপণে একট! ঘুষি মারতে 
পারলে মন বুঝি তার কিছুটা তৃপ্তি পায় । ও-ও দাড়িয়ে ছিল 
তাদের বাড়ির কাছে! ও-ও তার ওপর নজর রেখেছে! 

কোন মতে নিজেকে আইরিন সংযত করে রইল। ছুই 
চোখে ফুটিয়ে তুলল বিদ্বেষ আর দ্বণা। ভাবতে লাগল, নিজের 
মনের কথাটা ওকে বলবে কিন!। ওর সম্পর্কে তার কি ধারণ! 
হয়েছে মুখের ওপর জানিয়ে দেবে সে-কথা ? 

কী দরকার! 

কিছু না বলে হঠাৎ সে পিছন ফিরল--ফিরেই কোনদিকে 
ন! তাকিয়ে হনহন করে হাঁটতে শুরু করে দিল। মিশে গেল 
জনতায়। 

স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে রইল কার্ল। বিভ্রান্ত দুই চোখের 
দৃষ্টি, হাত দুটি অসহায় হয়ে ঝুলে পড়েছে দু'পাশে । কী করবে 
ভেবে পাচ্ছে ন|। অনেকক্ষণ সে দাড়িয়ে রইল পাথরের 
মূ্তির মত। তারপর একসময় প্রবল জনস্রোত তাকে টেনে নিন 
আপন বুকে, ভাসিয়ে নিয়ে চলল । বঝরাপাতার মৃত জনতা- 
প্রবাহে কার্ল” ভেসে চলল__ভেসে চলল না-জানা সমুদ্রের 
সন্ধানে ৷ 


৫ ৭৩ 


শান্তির জন্যে আইরিন বড় লালায়িত হয়ে উঠেছিল, পরের 
দিন ফের একট! চিরকুট পাওয়ার সাথে সাথে ধূলিসাৎ হয়ে 
যায় তার সমস্ত আশ| ৷ আবার টাকার তাগাদা! ! এবার 
একশ নয়, তার দ্বিগুণ_-দু'শ ক্রাউন ! 

নতুন করে আতঙ্কের চাবুকে সে জর্জরিত হয়ে ওঠে ৷ তবু 
বিন! প্রতিবাদে দাবি মেনে নেয়। 

কিন্তু, এরপর ? 

এইভাবে যদি দিনকে দিন দাবির বহর বেড়ে চলে, পার 
তার নিজের হাতে অবিশ্যি বেশ-কিছু রয়েছে, কিন্ত সকলের 
চোখ এড়িয়ে এভাবে ওর খীই মিটিয়ে চল! সম্ভব কতদিন ? 

চাই-কি, কালই হয়ত ও চারশ ক্রাউন চেয়ে বসবে। 
তারপর শ'য়ে শ'য়ে বেড়ে পৌছুবে হাজারে। 

'হাজারেও হয়ত রেহাই মিলবে ন, তাকে একেবারে নিঃস্ব 
না করে ছাড়বে না। 

নিঃস্ব হয়ে গেলেও কি নিস্তার পাবে ? 

পাবে ন|। তখন আসতে থাকবে বেনামা চিঠি। চিঠির 
প্র চিঠি। 

তারপর-_ঘটবে একদিন অনিবার্য সেই বিপর্যয় ! 

স্ব-নাশ ! 

অসম্ভব এই বিপর্যয়ের হাত এড়ানো । ঘুষ দিয়ে সে এখন 


৭৪ 


সেতুবন্ধ 


শুধু সময় নিচ্ছে, অর্থমূল্যে সময় কিনছে। সেই চরম সর্বনাশের 
মুখোমুখি হবার আগে কিছুদিনের জন্যে স্বস্তিতে বাচতে 
চাইছে। 

কিন্তু কোথায় স্বস্তি, কোথায় শান্তি! প্রতিটি মুহূর্ত কাটে 
আতঙ্কে । আতঙ্কে, আশঙ্কায়, উৎকণ্ঠায়। দুদণ্ড বসে পড়তে 
পারে না, সেলাইয়ে হাত চলে না। একেক সময় এত 
দুর্বল আর এমন অস্থুন্থ লাগে যে চলাফেরা পর্যন্ত করতে 
পারে না। মাথা ঘোরে, চোখে অন্ধকার দেখে, অবশ হয়ে 
আসে হাত-পা ৷ . বসে' থাকতে হয় তখন। চুপচাপ । ক্লান্ত, 
অবসন্ন । 

এত ক্লান্ডি, অথচ রাতে এক ফোটা ঘুম নেই। বিছানায় 
ছটফট করতে করতে কাটে বিনিদ্র রাত ! 

মনের ভাব তবু প্রকাশ করা চলবে ন!। তবু যথারীতি 
হাসতে হয়, কথা কইতে হয়_চালচলনে স্বাভাবিকতা বজায় 
রেখে চলতে হয়। এ যে কী অমানুষিক ব্যাপার, কে বুঝবে! 
চব্বিশ ঘণ্টা নিজের সাথে কীভাবে যে যুঝতে হয় বেচারা 
আইরিনকে ! 

চারপাশে যারা রয়েছে তার মধ্যে একজন শুধু আইরিনের 
ব্যথাট! যেন বোঝে। মনে হয়, শুধু সে-ই জানে কিভাবে * 
আইরিন দঞ্ধে দগ্ধে মরছে। কেনন! সব সময় যে তার চোখ 
রয়েছে স্ত্রীর দিকে। 

আর, সদাসতর্ক এই প্রহরার ফলে আইরিনকে আরো-বেশি 


৭৫ 


“লেতুবন্ধ 

সতর্ক হয়ে চলতে হয়। নিজে সতর্ক হওয়ার সাথে সাথে সত্ভর্ক 
দৃষ্টি রাখতে হয় স্বামীর প্রতিটি গতিবিধির ওপর ৷ 

স্বামী গোয়েন্দাগিরি করছে স্ত্রীর ওপর, স্ত্রী স্বামীর ওপর । 

দিনরাত ! 

আশ্চর্য এক লুকোচুরি খেল! শুরু হয়ে গেছে দুজনের 
মধ্যে। দুজনই অবিশ্বাস - করে দুজনকে- অথচ কেউই 
এ-সম্পর্কে সচেতন নয়। কাজটা যে অন্তায়_একজনেরও সেটা 
খেয়াল হয় না। তাই সেজন্যে লজ্জা বা অন্তুতাপও নেই 
কারে! মনে। 

ব্যাপারটা শুরু হওয়ার পর থেকে স্বামী বদলে গিয়েছেন 
অনেকখানি । প্রথমে কৌতুহলী হয়ে উঠেছিলেন, তার জায়গায় 
এখন দেখা দিয়েছে শাস্ত সহিষ্ণুত।। বিয়ের প্রথম দিকের 
মানুষটাকে মনে পড়ে। এমন ব্যবহার করেন তার সাথে 
যেন সে ভীরুহৃদয় কিশোরী এক ৷ স্ত্রীর জন্যে দরদের তার 
অস্ত নেই । 

সেই সঙ্গে অস্ত নেই তার স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টারও ৷ 
আইরিন যাতে সব কথা তাকে খুলে বলে-_স্ুযোগ পেলেই 
তাঁর পথ তিনি পরিষ্কার করে দেন। পরিষ্কার করে দেন 
মিষ্টিমধূর নানা কথা বলে, প্রেম-গ্রীতির নিদর্শন দেখিয়ে ৷ 

আইরিন সব বোঝে। বোঝে যে সভিই স্মী তার কভ 
সহৃদয় । কিন্ত_লজ্জা ! 

মুখ ফুটে কি করে একথা বলবে ওঁকে ! 


৭৬ 


সেতুবন্ধ 


তা সে মরে গেলেও পারবে না। তাই ক্রমেই সে নিজেকে 
গুটিয়ে নেয় বেশি করে-_এড়াতে চায় স্বামীর অযাচিত অনুগ্রহ । 


সরাসরি স্বামী একদিন প্রসঙ্গটা তুললেন। 

আইরিন বেড়াতে বেরিয়েছিল, বাড়ি ফিরে শোনে 
নাসারীতে ভীষণ হট্টগোল । স্বামী উত্তেজিত, তাঁর গলা বেশ 
চড়! । গভর্নেস ধমকাচ্ছে চাপা স্বরেঁ__ফুপিয়ে ফু পিয়ে 
ছেলেমেয়ের! কী্দছে। 

শুনেই সে আীৎকে ওঠে! তবে কি তার অনুপস্থিতিতে ফের 
এসেছিল সেই চিরকুট ? ভাবতেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল ৷ 
কোনমতে নিজেকে সে টেনে নিয়ে চলল, টলতে উঠতে 
লাগল সিড়ি দিয়ে৷ 

ব্যাপারটা কিন্তু আসলে গুরুতর কিছুই নয়। সুজি খুড়ী 
কদিন আগে যে খেলার ঘোড়াট! দিয়েছিলেন, তাই নিয়ে 
ঝগড়া । ঘোড়াটা রুডি পাওয়ায় মনে মনে ভীষণ হিংসে 
হয়েছিল হেলেনের। এমন সুন্দর খেলনাটা ভাই একা পাবে? 
তাছাড়া, ভাই কিন! ওটা! একবার ছু'তেও তাকে দেয় ন? 
তাই রাগে অভিমানে দিশেহারা হয়ে গিয়ে হেলেন করেছিল 
কি, ঘোড়াট| ভেঙে টুকরো টুকরো করে লুকিয়ে রেখেছিল 
আলমারির নিচে । 

আজ ধর! পড়ে গেছে ব্যাপারটা । ] 

হেলেন অবিশ্যি প্রথম থেকেই জোর গলায় না ন! করছে। 


৭৭ 


সেতুবন্ধ 

কিছুতেই দোষ কবুল করে না। গভর্নেস তখন বাধ্য হয়ে 
ওদের বাবাকে ডাকে বিচারের জন্যে । 

আইরিন যখন ঘরে ঢুকল, রীতিমত এক বিচারপৰ্ শুরু 
হয়ে গেছে। আসামী বেকস্থুর অপরাধ অস্বীকার করে চলেছে। 
মামলার সাক্ষী গভর্নেস, বাদী রুড়ি। 

বেশিক্ষণ নিজেকে হেলেন সামলে রাখতে পারল না। 
খানিক পরেই বেচারি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল । 

আইরিন তাকিয়ে আছে বিচারক স্বামীর দিকে--আর 
কোনদিকে তার দৃষ্টি নেই। মনে হচ্ছে, স্বামী যেন-সম্ভান 
নয়--তারই বিচার করতে বসেছেন! আইরিনই আসামী ! 

কে জানে, কালই হয়ত তাকে দাড়াতে হবে আসামীর 
কাঠগড়ায়--দাড়াতে হবে অবিকল ওই হেলেনের মত, ওরই মত 
কাপতে হবে থরথর করে, ঝরঝর করে কাঁদতে হবে। অবিকল 
নিজের মেয়ের মত ! 

যতক্ষণ হেলেন মিছে কথা বলছিল--বাপ তাকিয়ে ছিলেন 
কঠোর দৃষ্টিতে, কথা বলছিলেন গস্ভীর গলায়। কিন্তু নিজের 
দোষ সে স্বীকার করতে শুরু করা মাত্র_নরম হয়ে এল তীর 
চোখের চাউনি, কোমল হয়ে এল গলার স্বর। ধীরে ধীরে 
তিনি মেয়েকে তখন বোঝাতে লাগলেন--কী অন্তায়ই না সে 
করেছে। ছোট ভাইয়ের খেলার জিনিস কি এমন করে ভাঙতে 
হয়? ছিঃ! এসব হল িয়ে দুষ্ট, মেয়ের কাজ। হেলেন 
কি তবে দুষ্ট, মেয়ে ?' 


৮ 


‘সেতুবন্ধ 

বাপের কথা শুনে, নিজের দুষ্ট,মির কথ| মনে হওয়ায় হেলেন 
আবার কাদতে শুরু করে দেয় । অকপটে স্বীকার করে ফেলে 
সব অপরাধ! * 

তাড়াতাড়ি মেয়ের পাশে ছুটে যায় আইরিন । মেয়ে কিন্তু 
মাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় । 

স্বামীও তাকে ভংসনা করেন-_-এখন আদর জানানো ঠিক 
নয়। তাহলে ও প্রশ্রয় পেয়ে যাবে। আসামীকে সাজ! ন৷ 
দিয়ে ছেড়ে দিতে তিনি নারাজ। সাজা হেলেনকে পেতেই 
- হবে। 

কাল এক জায়গায় দু’ ভাইবোনের নেমস্তন্ভ । গত একমাস 
ধরে কালকের জন্যে ওর! দুটিতে হাপিত্যেশ করে রয়েছে। কিন্তু 
এই অপরাধের সাজা হিশেবে কাল বাড়ি থেকে হেলেনের 
বেরুনোই চলবে ন!-_নেমন্তন্যে যাওয়| তে দৃূরস্থান। 

ভয়ঙ্কর সাজা, সন্দেহ কি! রায় শোনার সাথে সাথে 
চিৎকার করে কাদতে শুরু করে দিল হেলেন। আর রুডি 
ঘরময় লাফাতে লাগল মনের আনন্দে । 

কিন্তু, তার আনন্দও স্থায়ী হল ন! বেশিক্ষণ । কেননা 
গম্ভীরভাবে বাপ জানিয়ে দিলেন, অন্যের দুঃখে আনন্দে 
নাচানাচি কর৷ অত্যন্ত অভদ্রত|। এবং ছেলেকে ভদ্রতা 
শেখাবার জন্যে তিনি ঘোষণা! করলেন-_-ভাই বোন কেউই 
কালকের নেমন্তন্যে যেতে পারবে না৷ ব্যস! 

বাদী ও- আনামী এবার একমন একপ্রাণ হয়ে চলে গেল 


৭৯ 


সেতুবন্ধ 
ঘর থেকে। ভাইবোনের দুঃখ এখন সমান সমান। দুজনেই 
এখন সমব্যধী। 

ঘরে রইল শুধু স্বামী আর স্ত্রী । 

একবার আইরিনের মনে হয়-_এই স্থুযোগ | নিজের 
অপরাধ যদি স্বীকার করতে হয়_এই সময় । মেয়ের দুষ্ট, মিকে 
উপলক্ষ্য করে অনায়াসে কথা শুরু করতে পারে। প্রথমে মেয়ের 
পক্ষ নিয়ে বলবে, যদি দেখে স্বামী সহৃদয়ভাবে গশুনছেন--নিজের 
কথা পাড়বে তখন। 

‘আমি বলছিলুম কি---ইয়ে---সত্যিসত্যিই ওদের নেমন্তৃন্তে 
যেতে দেবে ন? তাহলে ওর৷| কিন্তু মনে বড্ড কষ্ট পাবে--- 
বিশেষ করে হেলেনট! ।---আর.* এমন কীই-বা ও করেছে! 
ওই তে| একফোট। মেয়ে:--তুমি কি ওকে সাজা না দিয়ে ছাড়বে 
না, হ্যাগ। ? এত সামান্য ব্যাপারে:-*ওর জন্যে কি তোমার 
একটুও দুঃখ হচ্ছে না ?' 

স্বামী স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। 

‘ওর জন্কে দু:খ ? হ্যা, তা হচ্ছে। তবে এখন সেকথা! ভেবে 
ওকে সহানুভূতি জানাবার দরকার নেই। নেমস্তন্যে যেতে না 
পারার জন্যে ও কষ্ট পাবে ঠিক, কিন্তু সে-কষ্ট এমন-কিছু নয়। 
সহানুভূতির দরকার ছিল বরং কাল। ভাঙা ঘোড়াটার খোজে 
সারা বাড়ি যখন আমর! তন্নতন্ন করছিলাম, কে ওট! 
ভাঙতে পারে ভেবে সার! হচ্ছিলাম__ওর তখনকার মনের 
অবস্থা একবার কল্পনা কর দেখি। উৎকণ্ঠায় বুর দুরদুর 


ee 


সেতুবন্ধ 

করছে_-্পষ্ট বুঝছে যে ব্যাপারটা আজ হোক কাল হোক 
জানাজানি হয়ে যাবেই, তবু মুখ ফুটে কিছু বলতে ভরস! পাচ্ছে 
না। সাজার চেয়ে এই যে অনিশ্চিত আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা 
এ অনেক-বেশি ঙয়স্কর। কেননা, সাজার মেয়াদ একসময় শেষ 
হয়--কিন্তু এই আতঙ্ক বা উৎক্ঠ! অশেষ ৷ এর চেয়ে বড় সাজা 
আর কি হতে পারে? খুকিকে আমি যে সাজা দিলাম তাতে ওর 
শাপে বর হল--সেই উৎকণঠার হাত থেকে বেচারি রেহাই পেয়ে 
বেঁচে গেল। মেয়ের চোখের জল দেখে ভুল বুঝো না। 
কাঁদছিল ও কাল থেকেই-_গোপনে পুমরে গুমরে কী্দছিল 
বলে চোখ দিয়ে জল পড়েনি-তাই বলে কি সে-কান্নায় কষ্ট 
কিছু কম? বরং এর চেয়ে তাতে যন্তরণ৷ বেশি। এখন ও 
প্রাণ 'খুলে কাঁদতে পারবে। আর ওর গোপন করবার কিছু 
রইল ন! । মনে মনে দক্ধে মরার চেয়ে.--” 

নিজের স্ত্রী, না মেয়েঁ-কাকে লক্ষ্য করে কথাগুলি বলছেন 
উনি? আইরিন তাকিয়ে থাকে স্বামীর মুখের দিকে, খুঁটিয়ে 
খু'টিয়ে লক্ষ্য করে স্বামীর মুখখানি । 

স্বামীর খেয়াল নেই । একটান। তিনি বলে চললেন, ‘আমি 
যা বলছি, এই সত্যি জেনে।। এতদিন আইনের ব্যবসা করে 
এট! আমি ভালোভাবেই বুঝেছি। অভিজ্ঞতা তে| জীবনে কম 
হল না৷ দেখেছি তো, আসামী যতক্ষণ না দোষ কবুল করে, 
ততক্ষণ তার মনে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠার অবধি থাকে ন|। ধর৷ পড়ে 
যাবার ভয়, সত্যকে গোপন রাখার আপ্রাণ প্রয়াস-_এই দুইয়ের 


৮১ 


সেতুবন্ধ 
প্রচণ্ড দ্বন্্ব যেন ওঠে তার মনে। কত বড় বড় সেয়ানা আসামী 
বলে এর ফলে ভেঙে পড়ে! প্রশ্নের পর প্রশ্ন কর! হচ্ছে_ 
অনর্গল প্রশ্নের তোড়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে সত্যটা 
আসামীর চোখেমুখে তখন এমন ভার ফুটে ওঠে যেন একটি দাত 
তার টেনে উপড়ে ফেল! হচ্ছে। আবার কখনো স্বীকারোক্তি 
দেবার জন্যে হঠাৎ সে সোজা হয়ে দাড়ায়, কিন্তু পারে না--মনে 
হয়, হঠাৎ কে যেন তার কণঠঁনালি চেপে ধরল । কঠঠনালী চেপে 
ধরে তার ভেতরের শয়তানটা--ভয় আর দুবুদ্ধি থেকে জন্ম যে 
শয়তানের । তখন ফের নতুন করে শুরু হয়ে যায় তার 
মানসিক সংঘাত! শুধু কি আসামী ? বিচারকেরও কি এর 
ফলে কম অশাপ্তি সইতে হয়! বরং এই মনস্তাত্বিক লড়াইয়ে 
আসামীর চেয়ে তার মনোকষ্টই বেশি। অথচ আসামীর 
চোখে সে তখন শত্রু, আমামী ভাবতেও পারে না যে তাকে 
সাহায্য করবার জন্যই বিচারক ব্যগ্র। আমার কথা যদি 
ধরে|_আমি অবিশ্যি আসামীকে শেষ পর্যন্ত মিছে কথা ৰলে 
যাবারই পরামর্শ দিই । কেননা আসামী পক্ষের উকিল হিশেবে 
এই আমার কর্তব্য । তাই বলে কি সব সময়েই ত| চলে ? চলে 
না। কারণ আমি যে জানি--দণ্ডাদেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার 
সমস্ত উৎক্ঠার অবসান হয়ে যাবে। তখন আর তার গোপন 
করার কিছু থাকবে ন৷৷---আমি তো ভেবেই পাইনে জেনেশুনে 
লোকে খারাপ কাজ করে কেন ? যদি করেই--সেকথ৷| স্বীকার 
করবার সাহস্টুকু কেন থাকবে ন! ? শুধু একটা মুখের কথা, শুধু 


২ 


সেতুবন্ধ 
একবার মুখ ফুটে নিজের অপরাধ স্বীকার করা-_এর জন্যে এত 
ভয়? কোন মানে হয় না এই ভয়ের । আসল অপরাধের 
শয়ে এই ভয়ের জন্যে যে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা 
‘তাহলে কি তুমি মনে করো-সত্যকে গোপন করার প্রধান 
(ভয়? লজ্জা বলে কিছু নেই ? নিজমুখে সব স্বীকার 
লজ্জা, স্েচ্ছায়--যাকে বলে-স্বেচ্ছায় নিজেকে সবার 
নিরাবরণ করার’ 
} কিছুটা বিস্মিত ও বিভ্ৰান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন 
চনায় আইরিন এমনভাবে অংশ নেবে, তিনি ভাবতে 
|| 
? লজ্জা হল ভয়েরই আরেক দিক। স্বীকার৷ 
টী ভয়ের চেয়ে মহত্তর ব্যাপার-_কেননা শাস্তির ভয়ে 
"হ্যা, বুঝেছি: আসলে:--’ 
সমাপ্ত রেখে স্বামী উঠে দাড়ালেন। অস্থিরভাকে 
তে লাগলেন ঘরময় ৷ 
হৃদয়ের গভীরে গিয়ে ঘ দিয়েছে। 
ন করতে করতে হঠাৎ স্ত্রীর সামনে এসে দাড়ালেন 
নখ তাকালেন। 

‘বুঝেছি !! হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন, তেমনি 
শান্তও হয়ে এলেন হঠাৎ। সংযত স্বরে বললেন, ‘অচেনা 
অজানা কোন মানুষের কাছে লজ্জার বাধ! আসে, স্বীকার করি। 
বাইরের লোকের সামনে লজ্জ! দেখা দেওয়৷| স্বাভাবিক--কারণ 


৮৩ 


সেতুবন্ধ 
এই নিয়ে তার! ঘেঁট পাকাবে, নান! বদনাম রটাবে। ভাগাড়ের 
হদিশ পেলে শকুনি যেমন হন্যে হয়ে ওঠে, খবরের কাগজে কোন 
কলঙ্কের কাহিনী পড়লে ওরাও তেমনি হয়ে যায়-_ওদের সামনে 
লজ্জা হওয়া খুবই স্বাভাবিক । কিন্তু যে-মানুষ একাস্ত আপনার 
জন তার কাছে লজ্জার কোন মানে আমি বুঝিনে। ' সেখানে 
কেন লজ্জা এসে বাধা দেবে?” 

‘আচ্ছা, মনে করো,” আইরিন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, 

' স্বামীর দৃষ্টি সে সইতে পারছে না, মিনে করে,” নিজের থরথর 
গলার স্বরে নিজেই সচকিত হয়ে ওঠে, “নে করো, নেই 
আপনার জনের সাথে তার সম্পর্কটা যদি এত-বেশি ঘনিষ্ঠ হয় 
যে লজ্জা দেখা দেওয়াই একান্ত স্বাভাবিক 1 

স্বামী যেন বজ্ঞাহৃত। 

‘তার মানে:----. তুমি---তুমি বলতে চাণ্ড------ তোতলাতে 
লাগলেন তিনি, সহসা কণ্ঠস্বর তার খাদে নেমে এল, আরে! 
নিষ্ঠ হয়ে উঠল, ‘তাহলে তুমি কি বলতে চাও নিজের দোষের 
কথ| হেলেন ওর কাছে.--মানে ওদের গভর্নেসের কাছে--- 
ফ্রাউলিন মেরীর কাছে---আরও সহজে স্বীকার করতে পারত ? 
আমার চেয়েও---” ‘ 

‘আমার তে| তাই মনে হয়। শুধু মনে হওয়া কেন-_ 
সত্যিই তাই। আর সকলের চেয়ে তোমাকে ও বেশি 
ভালোবাসে, তোমার মতামতের দাম ওর কাছে অনেক-বেশি-_ 
তাই ও অমন গেঁ ধরে ছিল। তাই তোমার সামনে নিজের 


৮৪ 


সেতুবন্ধ 
দোষ স্বীকার করতে লজ্জা পেয়েছিল । তোমাকে ভালোবাসে 
বলেই-_সকলের চেয়ে তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে 
বলেই j 
আইরিনের কথা জড়িয়ে যায় । 

স্বামী ফের পায়চারি শুরু করে দিয়েছিলেন, সামনে এসে 
দাড়ালেন। 

‘হয়ত তুমি ঠিকই বলেছ।---হ্যা, ঠিক কথাই বলেছ। 
আশ্চর্য! ভুলেও এটা একবারও আমার মনে পড়েনি !'-- 
তোমার কথা মেনে নিলাম। কিন্তু--‘মনে কোরে| ন! যে ক্ষমা 
করতে আমি পারিনে-_আমি পাষাণ !'-না ন! আইরিন, আমার 
সম্পর্কে অমন খারাপ ধারণা করতে তোমায় আমি কক্ষনো 
দেব ন|। দয়াধর্ম আমার শরীরেও আছে, প্রয়োজন হলে আমিও 
যে সবকিছু ক্ষমা করতে পারি_' 

আইরিনের দুই কান ঝ' ঝ' করে। আপনা থেকেই কি 
কথাগুলি ওঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে, ঝোকের. মাথায় ? 
না, ইচ্ছে করে উনি বলছেন এসব কথা| ? এ দিয়ে কিছু বলতে 
চাইছেন? কী বলতে চাইছেন? 

আইরিন কাঠ হয়ে দাড়িয়ে রইল 

‘হা, আমিও ক্ষমা! করতে জানি, আইরিন__অতএব, সাজা 
বাতিল। হেলেন মুক্ত! যাই, এক্ষুনি গিয়ে ওকে সুখবরটা৷ 
দিয়ে আসি। কিগো, এবার খুশি হয়েছ তে! ? নাকি আরও 
কিছু বলার আছে? আর কী চাও, বলো ?'-'যাক, আমিও 


৮৫ 


সেতুবন্ধ 

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলাম। কী অন্তায়ই যে করতে 
যাচ্ছিলাম ! বুঝলে আইরিন, মানুষ যখন--'মানুষ যখন--" 

আইরিন ভাব দেখায় যেন স্বামী কি বলতে চাইছেন কিছুই 
সে আন্দাজ করতে পারছে না। নিজের অজান্তেই সে এক পা 
এক পা করে এগিয়ে যায় স্বামীর সামনে । তার মনের কথাগুলি 
ঠোটে এসে পড়েছে, থরথর করে কাপছে তার ঠোঁট দুটি 
অন্ুচ্চারিত আবেগে । 

ওদিকে স্বামীও এগিয়ে আসেন একটু একটু করে। স্ত্রীর 
জীবনের দুর্বহ বোঝার ভারট! যেন নিজ হাতে তিনি সরিয়ে 
দিতে চান। উদ্ধার করতে চান অভাগিনীকে। 

আইরিন চোখ তুলল, স্বামীর চোখে চোখে তাকাল_ 
দৃষ্টি বিনিময় হল। কী আকুল আকুতি ফুটে উঠছে ওঁর নীরব 
দুই চোখের ভাষায় £ বলুক, বলুক, এই তে! সময়__সব আইরিন 
বলে ফেলুক ! 
মুহূর্তে স্বাঙ্গ শিথিল হয়ে আসে, স্বামীর চোখের দিকে 
তাকিয়ে সমস্ত সাহস উবে যায়। হাত দুটি নেতিয়ে পড়ে 
দুপাশে । 

চকিতে আইরিন ঘুরে দাড়াল । 

‘অসম্ভব ! একেবারেই অসম্ভব !! আইরিন ভাবে, ‘না না 
না, তা আমি কোনমতে পারব না৷! নে-কথ৷ স্বীকার করতে 
পারব ন! আমি ! যে-কথাগুলি বলতে পারলে শাস্তিতে হৃদয় 
আমার ভরে যাবে, আমার মুখই যে তা উচ্চারণ করতে নারাজ ৷! 


৮৬ 


সেতুবন্ধ 
অন্তরের অন্তন্তল থেকে আইরিন চাইছে_অবিলম্বে অবসান 
হয়ে যাক এই অন্ত্দাহের ৷ এক্ষুনি সব কিছু উনি জেনে ফেলুন 
এই মুহূর্তে । 
কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার যে তার সাহস নেই! 


৮৭ 


আইরিনের এই আন্তরিক কামনাটা সফল হবার সুযোগ এসে 
গেল অপ্রত্যাশিত ভাবে। এত তাড়াতাড়ি যে এর হেস্তনেস্ত 
ঘটে যাবে, আইরিন নিজেও ভাবেনি। 

সেই ব্ল্যাকমেলিংয়ের ব্যাপারটা পক্ষকাল ধরে চলার পর 
আইরিন বুঝল-_এবার সে সামর্থ্যের শেষ সীমায় পৌছে গিয়েছে। 

দিন চারেক হল ‘ইয়েটা’র দর্শন নেই। কিন্তু আতঙ্কটা এখন 
এমন মজ্জায় মজ্জায় মিশে গেছে যে, সদরে ঘণ্টাধ্বনি শোনামাত্র 
বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। সবসময় অধীর হয়ে থাকে__কখন আসে; 
কখন আসে! তার এই অধীরত ক্রমে পরিণত হয় প্রতীক্ষায় ৷ 
ব্যাকুল প্রতীক্ষায় । কেনন! একবার ওর দাবি মেটানো মানে 
অস্তত একটি সন্ধ্যার শান্তি । একটি সন্ধ্যা অন্তত ছেলেমেয়েদের 
নিয়ে দুদণ্ড স্বন্তিতে কাটাতে পারবে, নিশ্চিন্ত মনে কিছুক্ষণ 
বেড়িয়ে আসতে পারবে। 


নিচে থেকে ঘণ্টাধ্বননি ভেসে এল। শুনেই তাড়াতাড়ি 
নেমে এল আইরিন । 

সামনে দাড়িয়ে এক আগস্তক-_কেতাহ্রস্ত পোশাক- 
পরিহিত! এক ভদ্রমহিল|। টুপির কী বাহার! -'না না, এতো, 
অজানা আগস্তক নয়_ওই তে| টুপির নিচে দেখ! যাচ্ছে 
মুখখান!-_-অতিপরিচিত সেই ঘৃণ্য মুখচ্ছবি ! 


৮৮ 


সেতুবন্ধ 

যাক, ভাগ্যিশ দেখা হয়ে গেল!’ 'স্ত্রীলোকটি বলল, 
‘আপনার সাথে একটা বড্ড জরুরী কথা আছে।’ বলেই 
অন্তুমতির অঁপেক্ষা না করে আইরিনকে ঠেলে-সরিয়ে হলের মধ্যে 
ঢুকে পড়ল । তারপর স্ট্যাণ্ডের কাছে এগিয়ে গিয়ে সযতনে 
রেখে দিল তার লাল রঙের ছাতাটি। নিধিকার। 

ভাবখানা এমন-যেন এই বাড়িঘরদোর ওর একেবারে 
নিজস্ব সম্পত্তি! নিজের বাড়িতে পা দিয়ে যেন হাত-পা ছড়িয়ে 
বাঁচল ! এমন একটি প্রাসাদোপম বাড়ির মালিকোচিত গর্বও 
রয়েছে সেই সঙ্গে । 

পাশেই বৈঠকখানার দরজ! ৷ সেইদিকে তাকিয়ে স্ত্রীলোকটি 
বলল, ‘কি, ওখেনে,? না-কি এখেনেই ?' স্বরে তার চাপ 
হাসি। 

আতঙ্কে বোব| হয়ে গেছে আইরিন। বাধা দিতে চাইছে 
প্রাণপণ, শক্তি নেই। 

‘না না, ওখেনেই চলুন’ বৈঠকখানার দিকে হাত তুলে 
আবদেরে স্থুরে বলল স্ত্রীলোকটি, ‘হু মিনিটে আমাদের কাজ 
শেষ হয়ে যাবে। আপনি চাও তে দু’ সেকেণ্ডেই সেরে 
দেব’খন। চলুন ৷ 

একটি কথাও না বলে শ্রীমতী ভাগনার তার অনুসরণ করে॥ 
ভেতরে ঢুকে বন্ধ করে দেয় দরজা । 

বেহায়| মাগীটার কী সাহস! জোর করে ও কিনা আমার 
বাড়িতে আমারই ঘরে এসে ঢোকে-_-একবার আমায় জিজ্ঞেস 


৬ ৮a 


সেতুবন্ধ 
করাও প্রয়োজন মনে করে না! এত সাহস ওর-_-কই, আগে 
তো কোনদিন এটা টের পাইনি ৷’ মনে মনে আইরিন ভাবে, 
মুখে কিন্তু কিছু বলতে পারে না। 

জেগে জেগে সে যেন দুঃস্বপ্ন দেখছে। 

‘বাঃ সোন্দর ঘরখান! কিন্তুক." চারপাশে একবার (চোখ 
বুলিয়ে নিয়ে স্্ালোকটি বসল । '‘ঈজিচেয়ারটাও বেড়ে--বসে 
কী আরাম !-:'আর, আমার !? ফোঁস করে একটা নিশ্বাস 
ছাড়ল । ‘ঘরভর! কত্ত ছবি! কী সাজানো-গুছনো !---আর, 
আমার! বসবার একট! চেয়ার পর্য্যন্ত নেই ! সত্যি বলছি 
গা-ভারী সোন্দর !' 

‘ইয়েটা'র স্পর্ধায়' আইরিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। ওর 
কথাবার্তা শুনে কথ! বলার ধরন দেখে ধৈর্যের বাঁধ তার 
ভেঙে যায় । ) 

সামান্য একট! র্যাকমেলারের_একট! ক্রিমিনালের_ 
এতখানি সাহস! 

বোমার মত ফেটে পড়ে আইরিন। 

তুমি.-‘তুমি একটা জোচ্চোর.--তুমি.--তুমি একটা র্যাক- 
মেলার--.কী চাও তুমি ? কোন্‌ সাহসে তুমি আমার বাড়িতে পা 
দিয়েছ ? ভেবেছ এতদিন কিছু বলিনি বলে চিরকাল আমি মুখ 
বুজে সব সয়ে যাব, ন? তোমার জুলুম আর আমি সইব না । 
আর একটি দিনের তরেও ন । এই আমি প্রতিজ্ঞা করছি 

‘আহা-হা, আস্তে! আস্তে গো ঠাকরুন আস্তে-_অত 


ae 


সেতুবন্ধ 


চটেঁচ্যোও না, ঝি-চাকরর৷ কোখেকে কে শুনে ফেলবে। 
তখন আবার:-'অবিশ্যি আমার তাতে কিছু যায় আসে না 
ক্ষেতি হবে আপনারই । আমি তো দোষ করিইছি.--হ্যা, অন্তায় 
করিছি আমি। এতে যদি আমার জেলও হয়-হোক। 
এভাবে উপোস করে মরার চাইতে জেল অনেক ভালে । 
সেখেনে তবু খেয়েপরে বাঁচব । কিন্তুক--“ভাগনার-গিন্নি হলেন 
গিয়ে মান্তিগন্তি বড়মোক মান্যের পরিবার--তেনার কি 
গরীবগুর্বোর মতন:--হ্য! বাপু, চেঁচামেচি করার আগে ভালো 
করে চারপাশ দেখেশুনে নাও,'-“দরজাটা ঠিক-ঠিক বন্ধ হয়েছ 
তে| ?---কে কোথায় আড়ি পেতে আছে কে জানে !'--তা’পর 
আমায় যা খুশি বলুন,মারুন-ধরুন কেটে ফেলুন--রা’টি করবনি ৷ 
শুধু দরজাট!।_ 

আকস্মিক ক্রোধে মনে সাহস জেগেছিল, সেই সাহসেই 
আইরিন ফু'সে উঠেছিল-_কিন্ত স্্রীলোকটির কথাগুলি শুনে, তার 
শয়তানী-মাথা নিরাসক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে উবে গেল তার 
সমস্ত সাহস । 

শিক্ষকের কাঁছে পরবর্তী পাঠগ্রহণের জন্যে প্রতীক্ষারত 
শিশুর মত হঁ| করে সে তাকিয়ে রইল.ওর মুখের দিকে। : 

নিজেরই বাড়িতে নিজেরই বৈঠকখান!| ঘরে আইরিন যেন 
আগন্তক এক । 

ভয়ে জড়সড় হয়ে সে তাকিয়ে থাকে স্্রীলোকটার মুখের 
দিকে--উৎকণঠায় উদগ্রীব । 


a> 


সেতুবন্ধ 


‘ভণিতা বাদ দিয়ে সরাসরি কাজের কথাই পাড়ি, কি বলো 
ঠাকরুন? আপনি তো জানোই, দিনকাল আমার বড্ড খারাপ 
যাচ্ছে। কী বলব--বড় দুরবস্তা গো! ক’ মাসের ঘর ভাড়৷ 
বাকি পড়েছে, তাই নিয়ে বাড়িওল! চধ্বিশ ঘণ্টা খি চোচ্ছে। 
শুধু ঘর ভাড়|? দেনায় এক্কেবারে ডুবে রইছি। দিনরাত 
অশান্তি । আর সয় না|! তাই আপনার কাছে ছুটে এহু 
চটপট আমায় এখন শ’ চারেক ক্রাউন দিয়ে দাও দেখি 

‘অসম্ভব । অত টাকা আমি কোথায় পাব? তোমায় 
সত্যি কথাই বলি, আমার হাত প্রায় খালি হয়ে এসেছে। 
মাসিক হাতখরচের থেকে এর মধ্যেই তোমায় তিনশ ক্রাউন 
দিয়েছি। রোজ রোজ কোথেকে টাকা জোগাড় করব, বলতে 
পারে৷?’ 

‘কী যে বলেন! বড়নোক মান্যের ইস্তিরি, হাত বাড়ালেই 
তো আপনার! টাকা পেয়ে যান! একটুন চেষ্টা করলেই ওটা 
জোগাড় হয়ে যাবে’'খন। ভাবো ভাবো-ভেবে দেখ ঠাকরুন_ 
একটা ন| একটা উপায় ঠিক বেইরে যাবে!’ 

‘কিন্ত, সত্যিই আমার হাত প্রায় খালি। টাকা থাকলে 
আমি নিশ্চয় তোমায় দিতাম। বিশ্বাস করো--দিব্যি করে 
বলছি-_কুড়িয়ে-বাড়িয়ে বড় জোর শ’খানেক যদি পারি তো’ 

চারশ'র কমে আমার কাজ হবে না সে তো আপনাকে 
গোড়াতেই বলিছি।’ বাধা দিয়ে স্ত্রীলোকটি বলে। আইরিনের 
প্রস্তাবে কানও দেয় না। 


৯২ 


সেতুবন্ধ 

‘অত টাকা নেই আমার!’ হতাশায় কানন এসে যায় 
আইরিনের। অসহায়ের মত সে ছটফট করতে থাকে। নতুন 
করে এখন আশঙ্কা জাগছে-_এই বুঝি স্বামী এসে পড়লেন! 
নিজের বাড়িতেই বুঝি দেখা হয়ে যায় দুজনের মধ্যে ! 
কেলেঙ্কারির তাহলে আর অবধি থাকবে না। 

কান্নাজড়ানো স্বরে আইরিন বলল, ‘দোহাই তোমার_ 
বিশ্বাস করো আমার কথা। সত্যি অত টাকা নেই আমার 
কাছে। দোহাই’ 

‘অ!! তাড়াতাড়ি যাও ন৷ বাপু! দেরি হলে আবার’ 

“বিশ্বাস করে 

স্ত্রীলোকটা এবার আইরিনের মাথ! থেকে পা পর্যন্ত একবার 
চোখ বুলিয়ে নেয়_আইরিনের দামট! যেন সে যাচাই করে 
নিচ্ছে। 

‘কেন-হাতের ওই আংটি? ওটা! বাধা রাখলে চারশ 
কোন্‌ ছাড় তার চে অনেক বেশি পেয়ে যাবে। অবিশ্যি, আমি 
গরীবগুর্বো মানুষ, গয়নাগাটি পর! দূরে থাক, বাপের জন্মে এসব 
চোখেও দেখিনি--দামটামও জানিনে। তবে'-‘শ’ চারেক 
ক্রাউন:--ওটা বাধা রাখলে কম করেও চারশ ক্রাউন নিয্যস 
হবে। ওইটেই তাহ’লে_’ 

‘এই আংটি ! আইরিন আর্তনাদ করে উঠল । 

এটা তার বিয়ের আংটি, কক্ষনো সে এটা আঙ্ল থেকে 
খোলে ন৷। কত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে ছোট্ট এই 


৯৩ 


গেতুবন্ধ 
আইংটিটির সঙ্গে । পাথরটা অত্যন্ত ' পয়া, মানিয়েছেও কী 
চমৎকার ! 

এই আংটি ওকে খুলে দিতে হবে? 

‘এই আংটি!’ 

‘ক্ষেতি কি? আমি তে আর বেচতে বলছিনি। বা আমি 
নিজেও ওটা চাইনি । বাঁধা রেখে রশিদট! আপনাকে দিয়ে 
দেব, তা'পর সুবিধে মত আপনি খালাস করে নেসবেঁ-হয়ে 
গেল! আংটি তোমার মার যাবে নি--সে আপনি নিশ্চিন্ত থাক. 
ঠাকরুন। আমার মত গরীবগুর্বে৷ হাভাতে মনিষ্যি হীরেযুক্তো / 
নিয়ে কি করব !' / 

‘কেন তুমি এমন জুলুম করছ!’ কাতরস্বরে আইরিন বলে, 
‘কেন আমায় এত কষ্ট দিচ্ছ! আর যে আমি সইতে পারছিনে! 
তোমার কি একটুও মায়াদয়া নেই ? আমার মনের অবস্থাটা! 
একবার ভেবে দেখ তো! আমিও তো মানুষ ! দয়া করো 
দোহাই--আমায় একটু দয়া করে| ৷ 

দয় !! মুখ বিকৃত করে স্ত্রীলোকটি বলে, ‘দয়া! আমায় 
কে কবে দয় করেছে ? কেউ না৷! কোনওদিন কেউ আমায় দয়া 
করেনি। আমি না খেয়ে আজ মরতে বসিছিঁ-কেউ একবার 
ফিরেও তাকায় না। দয়া ! তোমার মত বড়নোক মান্যের বউকে 
দেখে আমার দয়া হবে! কেন হবে? কোন্‌ দুঃখে 

আইরিন জবাব দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সদর দরজা খোলার 
শব্দ কানে এল ৷ স্বামী! 


23 


সেতুবন্ধ 

স্বামী ফিরলেন অফিস থেকে। 

ভাববার অবসর নেই, কি করছে আইরিন নিজেও বুঝছে 
না--তাড়াতাড়ি আংটিট! খুলে দিয়ে দিল ওর হাতে । 

‘আহা-হা, অত ভয় পাচ্ছ কেন গা! ভয় নেই, আমি 
এক্ষুনি সরে পড়ছি! _স্ত্রীলোকটি অভয় দেয়। হলঘরে 
যে-পুরুষ মানুষটির ভারী পদশব্দ শোন! যাচ্ছে তিনি আর কেউ 
নন, তার জালে-আটক!-পড়া শিকারের--আইরিনের-- স্বামী ওই 
ভদ্রলোক-_সে তা টের পেয়ে গিয়েছে। তাই ন! ওর চোখে- 
মুখে সমস্ত অবয়বে ফুটে উঠেছে ভয়ের এই বিভীষিক৷। 

দরজা খুলে গৃহকর্তার দিকে সসম্রমে মাথা হেলিয়ে সে 
নমস্কার জানাল । আইরিনের স্বামী তাকে দেখেও দেখলেন না। 

স্ত্রীলোকটি বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে । 

সে চোখের আড়াল হওয়! মাত্র আইরিন সচেতন হয়ে 
ওঠে। প্রাপপণে শক্তি সঞ্চয় করে নিজে থেকেই শ্বামীকে 
বলে যে ভদ্রমহিলা একটা! ব্যাপারে খৌজ নিতে এসেছিলেন 
তাঁর কাছে। 

স্বামী কিন্ত তার কথায় কান দিলেন বলে মনে হল না। 
নিঃশব্দে তিনি খাবার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। 

খাবার টেবিলে বসে আইরিন হাতের আঙ্লটির দিকে 
তাকাল। আংটি নেই, তার জায়গায় গোলাকার একটি দাগ । 
তাকালেই চোখে পড়ে। সকলেরই চোখে পড়ে যাবে। { 

হাতটি সে লুকিয়ে রাখে। 


a৫ 


সেতুবন্ধ 


তবু মনে হয়, স্বামীর চোখ জোড়া যেন তার আংটিবিহীন 
আডঙ্‌লটির দিকেই তাকিয়ে রয়েছে নির্গিমেষ ! 

স্বামীর মন ভোলাবার জন্যে সে কথা বলতে আরম্ভ 
করে । আবোল-তাবোল অপ্রাসঙ্গিক নানা কথা বলে যায় 
অনগঁল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে। ছেলেমেয়েদের সাথে শুরু 
করে দেয় হাসিমশ_করা-_-এই সব করে চেপে রাখতে চায় 
উতথলে-ওঠা উত্তেজনা, আশঙ্কা । 

কিন্তু, সব বৃথা! কিছুতেই কিছু হয় না। কিছুতেই 
পরিবেশটা জমে ওঠে ন|। থেকে থেকে নেমে আসে স্ত্ধতা ৷ 

কেমন-যেন সুর কেটে গিয়েছে। ছোট এই পরিবারটি 
‘কোনমতেই আর একাত্ম হয়ে উঠতে পারছেন । 

আবার নতুন করে চেষ্টা করে আইরিন। শেষ চেষ্টা । 
ছেলেমেয়েদের নিয়ে পড়ে এবার । হাসির কথা বলে তাদের 
হাসাতে চায়_তার! হাসে না। ভাই বোনের মধ্যে ঝগড়া 
বাধিয়ে দিতে চায়_গলায় গলায় ভাব তাদের ঘোচে না৷ 

তবে কি সে ধরা পড়ে গেছে? এসব যে তার চেষ্টাকৃত 
অভিনয়_-সবাই কি সেটা বুঝে গিয়েছে? নইলে কেন এমন 
হচ্ছে? বাচ্চা দুটোকে হাসাবার জন্যে সে যত-বেশি চেষ্টা করে, 
ততবেশি যেন গোঁ ধরে বসে ওরা-হাসবে ন| কিছুতেই । 
কেন? 

শেষ পর্যন্ত আইরিন ক্লান্ত হয়ে পড়ল । ক্লান্ত হয়ে চুপ করে 
বইল। 


সেতুবন্ধ 
বাকি সকলেও চুপচাপ । শুধু কাটা-চামচের টুংটাং শব্দ । 
চারদিক নিস্তব্ধ ৷ 

‘তোমার আংটি কোথায় ? আচমকা জিজ্ঞেস করলেন স্বামী । 

অবশেষে হতে হল অনিবার্য সেই প্রশ্নের মুখোমুখি ! তবু 
একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে হবে। আরে একবার মিথ্যার 
আশ্রয় নিতে হবে। শেষবার । 

‘আংটি গেছে, সেই সাথে আমিও গিয়েছি-__মনে মনে 
আইরিন বলল । মুখে বলল, ‘আংটিটা? পালিশ করতে দিয়েছি । 
বডড ময়ল|৷ জমে গিয়েছিল!’ যুৎংসই মিথ্যেট! বলতে পেরে 
উৎসাহিত হয়ে ওঠে, ‘দু’একদিনের মধ্যেই গিয়ে নিয়ে আসব ৷’ 

ঝোকের মাথায় তো বলল--দু'একদিনের মধ্যেই! তার 
মানে-পরশু পর্যন্ত সময়। পরশুর মধ্যেই যে-করে-হোক 
ফিরিয়ে ওটা আনতেই হবে। যে-করেই হোক! 

এর মধ্যে উপায় কি একটা বার কর! যাবে ন! ভেবেচিন্তে ? 
নিশ্চয় যাবে। 

স্ব্তির নিশ্বাস ফেলে আইরিন-_শরীর :মন দুই-ই এখন 
হালকা লাগছে অনেকখানি । মন খুশি হয়ে উঠেছে_যাক, 
এতক্ষণে একট! হেস্তনেস্ত হল। পরশু পর্যন্ত তার মেয়াদ । 
আপাতত দুদিনের জন্যে তে নিশ্চিন্ত_তারপর য৷ হয় হবে। 
সেকথ| ভেবে এখন সে আত্মিক বল পাচ্ছে । এই দুদিন ধরে 
নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে। 

হয় জীবনের, নয় মৃত্যুর প্রস্তুতি 


৯ 


সেতুবন্ধ 

হয় বাঁচবে, নয় বরণ করে নেবে মৃত্যুকে । 

এই তার বিধিলিপি ! 

কথাট! মনে হওয়! মাত্র আইরিনের মন থেকে অবসান হয়ে 
গেল সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ের। এতদিন ধরে যে স্সায়বিক উত্তেজনায় 
ভেতরে ভেতরে সে উদ্ধ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, আর সেটার অস্তিত্ব 
রইল ন|। মন শাস্ত, সংযত হয়ে এল | মন থেকে মুছে গেল 
সমস্ত ভয়, ভাবনা--কেন যে, আইরিনও ত! বুঝতে পারে না। 

নতুন একট! শক্তি জেগে উঠেছে অন্তর থেকে, তৃতীয় এক 
₹ নয়নের যেন অধিকারিণী হয়েছে_নিজের হাতে নিজের জীবনকে 
এবার সে নিয়ন্ত্রিত করবে । নিজের খুশিমত, প্রয়োজনমত ৷ 

আপন অস্তিত্বের মূল্য যাচাই করে দেখে আইরিন। দেখে 
এখনে| তার মূল্য রয়েছে, তবে সেটা বজায় রাখতে হলে আরো 
সচেতন হতে হবে। সম্প্রতি যে-অভিজ্ঞতা হল, সেটাকে পুরোপুরি 
কাজে লাগাতে হবে। আত্মরক্ষার নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন 
করতে হবে। তা যদি পারে, তবেই তার পক্ষে বীচ! সার্থক । 

নইলে-_স্বামী যদি তাকে পরিত্যাগ করেন, তা হলে 
ব্যাভিচারিগীর মত অসীম কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে 

না না, ওভাবে বাঁচতে আইরিন পারবে না--কক্ষনো পারবে 
না। অত সইবার তার শক্তি নেই। সে-জীবনের বোঝা সে 
বয়ে বেড়াতে পারবে ন! । 

আবার, গত ক’ সপ্তাহ ধরে যে লুকোচুরি খেলা খেলে 
আসছে, সেট! চালিয়ে যাওয়াও অসম্ভব । আর তার সামর্থ্য নেই। 


ar 


+ ——m—_— ti A 2 Wainy hdiaeNi 


টা OIE INCE NCE 


সেতুবন্ধ - 

বড় ক্লান্ত আইরিন, বড় অবসন্ন । 

স্বামী, ছেলেমেয়ে, গভর্নেস, এমন-কি ঝি-চাকরদের পর্যন্ত 
সকলের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, সকলেই অস্বস্তি বোধ 
করছে। 

আর, সে নিজে? সে নিজেও কি নিজেকে সন্দেহ 
করে না? এক ফোটা আত্মবিশ্বাসও কি আর অবশিষ্ট রয়েছে? 

পালিয়ে যাবে? 

সে-প্রশ্নই ওঠে না। যেখানে গিয়েই আত্মগোপন করুক 
ওই ‘ইয়েট!’ গিয়ে ঠিক হাজির হবে। 

এক উপায় ছিল, স্বামীর কাছে সব স্বীকার করা। 

কিন্ত, তাঁও এখন অসম্ভব। বড় দেরি হয়ে গেছে। 

শুধু একটি পথ আজ খোলা রয়েছে তার সামনে-_যে-পথে 
একবার গেলে কোন পথিক আর ফিরে আসে না! 


2 


পরের দিন আইরিন সন্দেহজনক সমস্ত চিঠিপত্র পুড়িয়ে 
ফেলে ঘরদোর গোছগাছ করে রাখল। এড়িয়ে এড়িয়ে চলল 
ছেলেমেয়েদের_আর সে মায়ার বাঁধনে বাধা পড়তে চায় না। 
যে-সব জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক সুখের স্মতি 
সেগুলির দিকে ফিরেও চাইল না। পাছে ওগুলি তার চলার 
পথে বাধ! হয়ে দাড়ায়--পাছে ও-সবের মোহে সে বিচ্যুত হয়ে 
পড়ে তার প্রতিজ্ঞা থেকে। 

বীধন এবার কাটতে হবে। 

ঘরসংসার ঠিকঠাক করে আইরিন বাড়ি থেকে বেরোয় । 

কোথায় যাবে ঠিকঠিকানা নেই, অনির্দেশ যাত্রায় ঘুরতে 
লাগল পথে পথে। মনের যেন চেতন! বলতে কিছু নেই । 
ক্লান্তিতে মনটা! যেন মরে গিয়েছে। 

'পুরে| দুটি ঘণ্টা পথে পথে ঘুরে বেড়াল । আনন্দ 
বা প্রয়োজনের প্রেরণায় নয়, ছুবোধ্য একটা কর্তব্যের তাগিদে । 
যার দেখা পাবার গোপন আশায় বেরিয়েছিল, দেখা 
তার পেল না। এগিয়ে এসে তাকে সম্ভাষণ জানাবার জন্যে 
আশেপাশে কোথাও নেই সে। 

না থাক, সেজন্যে কোন আপসোসও নেই। এই হতাশা 
তার মনে রেখাপাত করল না। চারপাশে যেন প্রেতের সঞ্চরণ। 
নান্ুষের দিকে তাকালে মরা মানুষের মুখের কথা মনে পড়ে। 


১০০ 


সেতুবন্ধ 

জীবনের স্পন্দন নেই কোথাও। সব আজ মরে গিয়েছে, 
চিরদিনের মত তলিয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির অতলে । এদের সঙ্গে 
কোন সম্পর্ক আইরিনের আজ নেই আর। 

হঠাৎ আতঙ্কে সে শিউরে উঠল-স্বামী ! স্বামীর সাথেই 
কি চোখাচোখি হল এইমাত্ৰ ? 

যাকে দেখে সে আঁৎকে উঠেছিল দেহটা তার চোখের 
পলকে আড়াল পড়ে গিয়েছে একটা গাড়ির আড়ালে । 

নিজের মনকে আইরিন প্রবোধ দেয়-_ন! না, ও লোকটা 
তার স্বামী কখনো নয়। তিনি তো এখন আদালতে নথিপত্র 
নিয়ে ব্যস্ত । এখন কি তার রাস্তায় রাস্তায় ঘোরবার সময়! 

হাঁটিতে হাঁটতে সময়ের দিকে খেয়াল ছিল না। আইরিন 
যখন বাসায় খেতে এল, বেশ দেরি হয়ে গেছে। 

তবে কিনা, দেরি শুধু তার একারই হয়নি, স্বামীও 
আজ দেরি করে এলেন। সে ফেরার মিনিট কয়েক 
পরে তিনি ফিরলেন! মনটা তাঁর কেমন-যেন বিভ্রান্ত বলে 
মনে হল। 

কতক্ষণে রাত হবে-মনে মনে আইরিন হিশেব করে। ঈশ ! 
এখনো অনেক দেরি-এখনো অনেকগুলি ঘণ্টার ব্যবধান ! 

অথচ, বিদায় নিতে লাগবে মাত্র কয়েকটি মিনিট__ভাবতেও 
বিস্ময় 1! এত সব আদরের সামগ্রী ছড়ানে৷ চারপাশে-_কিন্ত 
মহাপ্রন্থানের পথের পথিকের কিছুই সাথে করে নেওয়! চলবে 
না! কী দাম তবে এসবের ? 


{সেতুবন্ধ 

ভাবতে ভাবতে ঘুমঘুম পায়। যন্ত্রচালিতের মত আইরিন 
উঠে দাড়ায় । বাড়ি থেকে বেরোয় । আবার হাঁটতে শুরু করে। 

যন্রচালিতের মত হেটে চলে। 

মাথাট! একেবারে ফাপ। হয়ে গিয়েছে। কোনরকম ভাবনা 
চিন্তা নেই। নজর নেই আশেপাশের দিকে-_অন্ধের মত 
এগোয় আইরিন। 

রাস্তা পেরোতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল 
একটুর জন্যে । ডাইভার যা-তা বলে উঠল আইরিনের কানেও 
যায় ন|। নিবিকার সে এগিয়ে চলে। কী ভয়ঙ্কর একটা 
দুর্ঘটন! ঘটতে যাচ্ছিল_মনে তার কোন বিকার নেই। যদি 
ঘটত দুৰ্ঘটনা, কী এমন হত? কিছুই না। 

আপনা থেকেই সমাধান হয়ে যেত সব সমস্তার_তার বিনা 
চেষ্টাতেই স-ব সমস্তার সমাধান হয়ে যেত ! 

রাস্তা দিয়ে হেঁটে আইরিন চলে, স্রোতের মুখে কুটোর মত 
ভেসে চলে। জানে না কোথায় এই চলার শেষ, জানতে চায়ও 
ন!। আরুকিছু তাকে ভাবতে হচ্ছে না, ভাবনার পাট চুকে 
গিয়েছে। 

হঠাৎ আইরিন সচেতন হয়ে তাকাল চারপাশে--একী ! 
আনমনে ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছে তার প্রেমিকের বাসার 
কাছে! আশ্চ্ধ যোগাযোগ ! একি তবে কিছুর ইঙ্গিত? 
কিসের ইঙ্গিত ? 

হয়ত কাৰ্ল তাকে সাহায্য করবে । অন্তত র্্যাকমেলারের 


১০২ 


সেতুবন্ধ 
ঠিকানাট! ও নিশ্চয় জানে । ভাবতেই মন আশার আভাসে খুশি 
হয়ে ওঠে । আগে কেন এটা তার মনে পড়েনি? তাহলে 
তো কবে এর একটা নিষ্পত্তি হয়ে যেত! প্রথমেই কেন সে 
কালকে সব খুলে বলে নি! 

কালে'র বাড়ির সামনে দাড়িয়ে আইরিন স্বস্তির নিশ্বাস 
ফেলল ৷ মনে মনে খুশি হওয়ায় শারীরিক ক্লান্তিও উবে যায়। 
এতক্ষণ গা-হাত-পা ভার-ভার লাগছিল, আর এখন সেটা বোধ 
করছে ন! । মনের বিষগ্নত! ধূয়েযুছে গেছে আশার জোয়ারে_ 
ফিরে এসেছে স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি। 

আইরিন ঠিক করল-_€ই ইয়েটার বাসায় তাকে নিয়ে 
যাবার জন্যে কালকে সে পেড়াগীড়ি করবে। যে-করেই হোক 
কালকে সঙ্গে নিয়ে যেতেই হবে ওর ওখানে, আজই এই 
ব্যাপারটার ইতি করে ফেলবে । 

কালকে দিয়ে চাপ দেবে ওর ওপর । কালের সাহায্যে 
ওর এই ব্ল্যাকমেলিং করাটাকে চিরদিনের জন্যে বন্ধ করতে 
হবে ।---হয়ত মোটা রকম ঘুষ পেয়ে গেলে ইয়েট! রাজি হয়ে 
যাবে শহর ছেড়ে চলে যেতে ৷--- 

কালের প্রতি দুর্ব্যবহারের জন্যে আইরিনের এখন বড় 
আপসোস জাগে । কিন্তু---করুক সে যতই খারাপ ব্যবহার 
ও কি তাই বলে এখন মুখ ফিরিয়ে থাকবে? না, না,তা কি ও 
কখনে| পারে? ও তেমন ছেলেই নয়। নিশ্চয় কাল তাকে 
সাহায্য করবে_আইরিনের ভাতে একটুও সন্দেহ নেই। 


১০৩ 


সেতুবন্ধ 

পরিত্রাণের এমন সহজ আর স্বাভাবিক উপায়টি কিনা তার 
মনে পড়ে গেল এখন-_-একেবারে শেষ মুহুর্তে ! 

তাড়াতাড়ি সিড়ি দিয়ে আইরিন ওপরে উঠে এল। 
ইলেকটি,ক বিলের বোতাম টিপে প্রতীক্ষা করতে লাগল । 

কেউ এসে দরজা খুলল না। 

কিন্তু, ভেতরে লোক রয়েছে সন্দেহ নেই। পা টিপে টিপে 
চলাফেরার অস্পষ্ট শব্দও শোনা যাচ্ছে। 

আবার বোতামে চাপ দিল আইরিন । 

তবু খুলল ন! দরজা। শুধু দরজার আড়ালে শোনা গেল 
মৃতু একটা খসখসানি। 

আইরিন এবার অধৈর্য হয়ে ওঠে। জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন 
জড়িত এর সাথে, নিক্কিয়ভাবে আর কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকা যায়? 
বোতামটা টিপে ধরে রইল--শুরু হল একটানা ঘণ্টাধবনি_ 
ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং :..-- 

শেষ পর্যন্ত খিল খুলল, একটুখানি ফাক হল দরজার পাট । 

‘আমি! আমি এসেছি--’ ফিশ ফিশ করে আইরিন বলল, 
‘কখন থেকে’ 

দরজা খুলে ফেলল কাল“। 

‘তুমি ! ফ্রাউ ভাগনার ! আমি-- আমি-- ‘তুমি যে আসবে 
**‘আমি ভাবতেও পারিনি ।---আমার এই বেশবাসের জন্যে 
মাপ চাইছি--দাড়াও---এক্ষুনি আসছি. --৷' 

কাল” আমতা আমতা করে। আইরিনকে দেখে সে 


১০৪ 


সেতুবন্ধ 
বেকুব হয়ে গিয়েছে। গায়ে শুধু একটা গেঞ্জি । এ বেশে কখনো 
ওর মুখোমুখি হওয়া যায় ! 

‘তোমার সাথে আমার একটা জরুরী কথা আছে-ভীষণ 
জরুরী । এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না। শোন, আমার 
একটা উপকার তোমায় করতে হবে, কাল!’ এক নিশ্বাস 
আইরিন বলে, ‘আঃ দরজা থেকে সরো না-_-আমায় ঢুকতে দাও। 
ভয় নেই, তোমার বেশি সময় আমি নষ্ট করব না। স-রে|_' 

ণ্কন্ত-.-‘ইয়ে--“মানে--"-আমি এখন বড্ড ব্যস্ত! এখন 
তোমার সাথে কথা বল!'-"” 

‘বাজে বকো| না! আমার কথা আগে শুনতেই হবে। 
বলছি বেশিক্ষণ আমি থাকব ন! ৷ তা ছাড়া'--তা ছাড়া--‘এর 
জন্যে তুমিই তো দায়ী । আমায় এখন সাহায্য করা তোমার 
কর্তব্য । নিজের কর্তব্য কেন তুমি করবে না ?'--আমার আংটিটা 
তোমায় ফিরিয়ে এনে দিতে হবে, কাল*-হ্যা! হ্যা, আমার 
আংটি! অমন হী করে কি দেখছ ? বেশ, তা না পারে_ওর 
ঠিকানাটা অস্তত আমায় দাও।'--দিনরাত আমার পেছনে 
ফেউয়ের মত লেগে ছিল, আর এখন-__এখন ওকেই যখন 
আমি খুঁজছি-কোখাও পাচ্ছিনে। পাব কি করে, ঠিকানা 
জানলে তে! ওর ঠিকানাটা__বলি কানে যাচ্ছে আমার 
কথাগুলো--ওর ঠিকানাটা আমায় দাও। আমায় তুমি সাহায্য 


শমেতুবন্ধ 

চমৎকার !}! তিক্তস্বরে আইরিন বলল, ‘এমন ভাব দেখাচ্ছ, 
আমি কার কথা বলছি তুমি যেন বুঝতেও পারছ না !---ওগো, 
তোমার সেই প্রাণেশ্বরী-_আমার আগে যিনি এসেছিলেন। 
এবার চিনেছ ?'-*এখান থেকে বেরোবার সময় একদিন আমায় 
হাতেনাতে ধরে ফেলে, তারপর থেকে আমার জীবন অতিষ্ঠ 
করে তুলেছে--‘বেপরোয়! ব্ল্যাকমেলিং চালিয়ে যাচ্ছে_আজ 
আমি ঠিক করেছি, এর একটা হেস্তনেস্ত করবই করব । ওর 
জন্যে জীবন দহুর্বহ হয়ে উঠেছে।.:-আংটিটা আমার ফেরৎ 
চাই-ই চাই। বড় জোর-*‘আজ সন্ধ্যের মধ্যে । লক্ষ্মীটি, কাল’, 
আমায় তুমি সাহায্য করো:--ওর ঠিকানাটা!?--- 

“্কন্ত_’ 

‘ফের কিন্তু! আমার কথা রাখবে কি রাখবে না-স্পষ্ট 
জানিয়ে দাও। অত কিন্ত-কিন্তু আমি শুনতে চাইনে !! 

“কিন্ত-বিশ্বাস করো-কার কথা তুমি বলছ আমি 
কিচ্ছু বুঝতে পারছিনে। কোনদিন কোন ব্ল্যাকমেলারের 
সাথে 

‘তুমি তাকে চেনো না, কেমন? তার মানে, কর গুণে সে 
সবকিছু টের পেয়ে গিয়েছিল, তাই ন|? আপনা থেকেই 
আমার নামধাম জেনে ফেলেছিল-_এই তুমি বলতে চাও? 
বোধ হয় তোমার মতে-_ওকে ব্ল্যাকমেলার ভেবেও আমি 
মহা ভুল করেছি ? এ সব স্বপ্ন! সব মায় !-কি বলে৷? 

সশব্দে হেসে উঠল আইরিন। হিংস্র হাসি। 


১০৬ 


সেতুবন্ধ 

কার্ল জড়সড় হয়ে পড়ল । ধক ধক করছে আইরিনের দুই 
চোখের মণি, তাই দেখে একবার তার মনে হয়_হয়ত ওর কথায় 
সত্যতা কিছু রয়েছে! 

কিন্তু ব্যাপারটা যে কী সেট! কোনমতেই বুঝে উঠতে 
পারছে ন৷। 

কাল উৎকঠঠিত হয়ে ওঠে। বলে, “শান্ত হও, আইরিন, 
দয়া করে শাম্ত হও। কেন অত উত্তেজিত হচ্ছ! নিশ্চয় তুমি 
ভুল করেছ। নিশ্চয় কোথাও একট! গোলমাল হয়ে গিয়েছে।-*' 
কিন্তু আমি:-‘ন! না---বিশ্বাস করো, সত্যি আমি কিছু 
জানিনে--তোমার কথ! সত্যি, আমি বুঝতে পারছিনে--বিশ্বাস 
করো-_কার কথা যে ne *এ বাসায় আসার পর থেকে 
আদমি মাত্র দুজনের সাথে:--’ 

‘তাহলে EEL Tea nd TENG 
তুমি রাজি নও ?' 

‘না নাসে কী! তোমায় যে-কোনরকম সাহায্য করতে 
পারলে আমি বলে কৃতার্থ_ 

“বেশ, তাহলে চলে,_আমর! ওর বাসায় যাই 

“কিন্ত-কার ‘বাসায়’? থতমত খেয়ে গেল কাল”। তার 
মনে হল, অতিপরিচিত সেই আইরিনের সঙ্গে সে যেন কথা 
বলছে না-পড়ে গিয়েছে এক পাগলের হাতে৷ 

‘তার বাসায়! গলায় জোর দিয়ে বলল আইরিন। ‘তুমি 
যাবে কি যাবে ন! তাই বলে ?' 


১০৭ 


সেতুবন্ধ 

“নিশ্চয় যাব-একশবার যাব। তোমাকে খুশি করবার 
জন্যে’ 

‘তবে কেন মিছে দেরি করছ! কেন বুঝছ না যে এ আমার 
জীবন-মরণের প্রশ্ন !' 

শুনে কোনমতে কাল” হাসি সম্বরণ করল । 

মোলায়েম স্বরে বলল, ‘কিন্তু--*মানে--*ঠিক এখনই আমার 
পক্ষে বাড়ি থেকে বেরুনো--যাকে বলে-_অসম্তব। একটু 
ব্যস্ত রয়েছি.:*এইমাত্র একজনকে গান শেখাতে আরম্ভ_' 

“গান শেখাচ্ছ? গেঞ্জি পরে এই বেশে তুমি গান শেখাচ্ছ ? 
ধাল্না দেবার আর লোক পেলে ন!!! বলতে বলতে উত্তেজনার 
মাথায় কালকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে আইরিন ঢুকে পড়ল 
ঘরের মধ্যে । - 

“মনে হয় ওটাও এখানে আছে-_তোমরা দুজনে মিলে 
আমায় নিয়ে খেলাচ্ছ। দুজনের মধ্যে সাট রয়েছে। ও নিশ্চয় 
তোমায় মুনাফার ভাগ দেয়, না? কিন্তু আমিও আজ ছাড়ছিনে 


-_এর শেষ দেখে তবে যাব। আর আমি কারো ভয় করিনে, 


যা থাকে বরাতে_' 
কাল’ ধরে রাখবার চেষ্টা করল, এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে 
দিয়ে হনহন করে আইরিন এগিয়ে চলল শোবার ঘরের দিকে। 
তাকে দেখেই চকিতে একজন সরে যায়। এতক্ষণ আড়ি 
পেতে শুনছিল। মেয়েটির দিকে তাকাল আইরিন, বিজ্রস্ত 
বেশবাস_কিন্ত যে-স্ীলোকটিকে সে খুঁজছে এ সে নয়। 


১০৮ 


A wee - 


সেতুবন্ধ 


“মাপ করবেন? বলেই তাড়াতাড়ি সে পিছন ফেরে, ‘আমি 
দুঃখিত! অত্যন্ত দুঃখিত !-:-কাল আপনাকে সব গুছিয়ে 
বলব। সত্যি বলতে-কি:--আমার সব কিছু যেন কেমন 
গোলমাল হয়ে যাচ্ছে---কিছুই আমি বুঝতে পারছিনে'-"” 

শেষের কথাগুলি বলে কালকে উদ্দেশ করে। এমনভাবে 
বলে যেন কার্ল অপরিচিত এক আগন্তক মাত্র । তার চালচলন 
দেখে কে বলবে যে কদিন আগে সে ওর প্রিয়তমা ছিল, ওকে 
প্রিয়তম বলে গ্রহণ করেছিল! 

মাথা ঘুরছে। হিশেবে কোথায় যেন মস্তবড একটা ভুল 
হয়ে গিয়েছে। কিছু ভাববার শক্তি নেই, কোনদিকে তাকাবার 
সামর্থযটুকুও না। 

চোখ বুজে আইরিন নামতে লাগল সিড়ি দিয়ে । তার মনে 
হচ্ছে, চরম বিচার তার হয়ে গেল। তাঁর প্রতি হয়েছে ফাসির 
আদেশ । 


পথ অন্ধকার 

পথের কোথাও কি সে লুকিয়ে রয়েছে? তার মুক্তির দূত 
কি পারে না কোন অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকতে ? 

যদি থাকত, প্রার্থনায় তার সামনে নতঙজাম্ণু হয়ে বসত 
আইরিন, করজোড়ে ভিক্ষা চাইত তার কাছে। যদি মুক্তি 
পেত-__মাসখানেক কি মাসদুয়েকের জন্যে অস্ত !---চলে যেত 
এই শহর ছেড়ে অনেক-::অনেক দুরে---গ্রামে.:-চারদিকে যার 
চোখ-জবূড়নো শ্যামল প্রাস্তর-:-মনোরম দ্রাক্ষাকুঞ্জ--ওই ব্ল্যাক- 
মেলারের হাত এড়িয়ে সেখানে সে পরম শাস্তিতে-- 

হঠাৎ আইরিন সচকিত চোখে সামনে তাকাল । মনে হল, 
‘রাস্তার পাশে_ওই দরজাটার আড়াল থেকে--কে যেন উকি 
মারল এই মাত্র। 

তাড়াতাড়ি সে এগিয়ে যায়---কিন্তু লোকটা ততক্ষণে অদৃশ্য 
হয়ে গেছে। 

মুহূর্তের জন্যে আইরিনের মনে হয়_আর কেউ নয়, তার 
স্বামী । তার স্বামীই ছিলেন দরজার আড়ালে। 

এখন, এই অবস্থায়, যদি দেখা হয়ে যেত তাঁর সাথে !--- 
আইরিন দ্বাড়াল---ভালো করে তাকাল সেইদিকে.--অন্ধকার। 
কেউ নেই। 

হাঁটতে হাটতে অদ্ভূত একটা অনুভূতি জেগে ওঠে তার 


১১০ 


সেতুবন্ধ 

মনে। কেবলি মনে হয়, কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। 
সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফেরে:--জনমানবের চিহ্নও চোখে পড়ে না। 
কী যে অস্বস্তি ! 

ওষুধের দোকান। 

আইরিন দোকানে ঢুকল । একটা প্রেসক্ৃপশন এগিয়ে 
দিল কাউন্টারের দিকে। 

দোকানে পা দিয়েই সে সচেতন হয়ে ওঠে এখানকার বিচিত্র 
পরিবেশ সম্পর্কে--“ওষযুধ ওজন করার ছোট্ট মেশিন-:-সার সার 
ওষুধের শিশি-বোতল:*-লাতিন হরফে লেখ! লেবেল প্রত্যেকটির 
গায়ে**‘দেয়ালে একটা ঘড়ি:-“অবিরাম তার টিক্‌টিক ধ্বনি-:* 
ওষুধের উগ্র-ঝ'ঝালো গন্ধ. 

কৃত পরিচিত আইরিন এই গন্ধের সাথে ! কত প্রিয় এই 
গন্ধটী তার! মনে পড়ে ছেলেবেলাকার কথ|-_ওষুধ আনবার 
দরকার হলে কত কাকুতি-মিনতি করে মা'র কাছ থেকে অনুমতি 
চৈয়ে নিত। প্রেসক্ৃূপশন হাতে নিয়েই ছুটত দোকানের দিকে। 
ওষুধের দোকানের এই উগ্র-ঝ'ঝালে৷ গন্ধট। বরাবর তার 
বড় ভালো লাগে, মনে যেন কেমন নেশা ধরায়। জানালায় 
জানালায় রঙ-বেরঙের গ্লোব সাজানোঁ_কী সুন্দর! তাই ন। 
মা'র কাছে-- 

মার কথা মনে পড়ে যায়-_তার কাছ থেকে তে বিদায় 
নেওয়া হয়নি! বুড়ি যখন সব শগুনবেঁসে যে কী ভয়ঙ্কর 
আঘাত*-‘মনটা ভয়ানক খারাপ হয়ে যায় আইরিনের ৷ বুড়িমা'র 


১১১ 


সেতুবন্ধ 
মুখখানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে---কিন্তু -*কি লাভ আর 
সেকথা ভেবে--কম্পাউণ্ডার নীলরঙের একটা শিশিতে তরল 
পদাৰ্থ ট| ঢালছে'-'মৃত্যু---ছোটট একটি শিশিতে.--শিরায় শিরায় 
বয়ে যাবে ওই তরল গরল:--৷ 

আইরিনের বুক হিম হয়ে এল । 

নিনিমেষ তাকিয়ে রইল-_লোকটা আঙ্‌লের চাপ দিয়ে 
দিয়ে ছিপি বন্ধ করছে_মোহমুগ্ধের মত সে তাকিয়ে তাকিয়ে 
দেখতে লাগল.::এবার রঙিন একট! লেবেল শিশির সঙ্গে 
লাগিয়ে দিচ্ছে--‘বিষ’। কাগজ দিয়ে ভালো করে মুড়ল . 
শিশিট|--.। 

অদূর ভবিষ্যতের কথা মনে করে সর্বাঙ্গ তার অবশ 
হয়ে যায়। 

দু ক্রাউন! কলম্পাউণ্ডার বলল । 

আইরিন যেন স্বপ্নের ঘোর থেকে চমকে জেগে ওঠে। 
ফ্যালফ্যাল করে তাকায় চারপাশে । ব্যাগ খোলে যন্ত্রের মত 

আর, হঠাৎ কে যেন তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে ওষুধের 
দামটা ছু'ড়ে দিল কাউনণ্টারে-তার ঝনাৎকার কানে এল 
আইরিনের। শিশিটা নেবার জন্যে এগিয়ে গেল একখান। 
হাত। 

চকিতে আইরিন ঘুরে দাড়ায় স্বামী ! 

স্বামী সামনে দাড়িয়ে । চাপা ডং শক্ত চোয়াল 
EY CR মাষ) 


১১২ 


সেতুবন্ধ 

আইরিনের মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে, কাউণ্টারে হেলান দিয়ে 
কোনমতে নিজেকে দাড় করিয়ে রাখে। 

স্বামী তবে তাকে এতক্ষণ ধরে অনুসরণ করছিলেন? 
হঠাৎ মনে হল, সেই দরজার আড়ালে স্বামীকেই তাহলে 
দেখেছিল! 

‘এসে!’ নিল্রাণ স্বরে স্বামী বললেন। 

অবাক হয়ে আইরিন দযাখে_কী বাধ্যই না সে এখন হয়ে 
গিয়েছে_বিনা প্রতিবাদে শিরোধার্য করে নিল স্বামীর আদেশ! 
. কি করছে হুশ নেই, আপনা থেকেই স্বামীর পাশে এসে 
দাড়াল । 

এগিয়ে চলল দুজনে । 

কেউ কারে! দিকে তাকাচ্ছে ন|। 

স্বামী এখনো শিশিট! হাতে করে রয়েছেন। 

কপাল থেকে ঘাম মোছবার জন্যে একবার তিনি দাড়ালেন, 
আইরিনও দাড়িয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে_নিজেরই অজাস্তে। 
স্বামীর দিকে এখনে! সে চোখ তুলে চাইতে পারছেনা । 

কথা নেই কারে৷ মুখে । তাদের ঘিরে রয়েছে পথের গুঞ্জন, 
তাঁদের চারপাশে জনতার প্রবাহ ৷ 

বাড়ির সামনে পৌছে স্বামী একপাশে সরে দাড়ালেন, 
আইরিনকে আগে ঢোকার পথ করে দিলেন। কিন্তু পাশ থেকে 
তিনি সরে যাওয়া মাত্র আইরিন যেন নিরবলম্ব হয়ে পড়ল, 
থরথর করে কীপতে লাগল । স্বামী তার একটা হাত জড়িয়ে 


১১৩ 


সেতুবন্ধ 

ধরলেন স্বামীর স্পর্শে সে শিউরে উঠল--তাড়াতাড়ি ঢুকে 
পড়ল বাড়ির মধ্যে । এগিয়ে চলল মাতালের মত--টলতে 
টলতে । 

নিজের ঘরে এল। স্বামীও এলেন পিছন পিছন। 

ঘর অন্ধকার । 

এখনে৷ মুখ ফুটে কেউ একটি কথাও বলেনি । 

স্বামী শিশির মোড়কটা ছি'ড়ে ভেতরের পদার্থ টুকু ফেলে 
দিলেন। তারপর খালি শিশিট! ছুড়ে ফেললেন এক কোণায় । 


ঝনঝন শব্দে সেটা চুর্ণকিচুর্ণ হয়ে গেল আবার আইরিন . 


উঠল। 

এখনে! দুজনে'মৌনমূক । 

অবশেষে স্বামীই' এগিয়ে এলেন, কাছে এসে দাড়ালেন 
একেবারে গায়ে গায়ে । 

তার ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের ছোয়! লাগছে আইরিনের মুখের 
ওপর । 

শক্ত মুঠোয় তার হাতখান৷ স্বামী ধরে রয়েছেন। 
॥ এই বুঝি ঘটে বিস্ফোরণ! দুরুদুরু বুকে সে ঝড়ের 
প্রতীক্ষ। করে। 

কিন্তু, স্বামী কিছুই বললেন না। 

হঠাৎ আইরিনের খেয়াল হয়_কই, ওঁকে মে যত ভয়ঙ্কর 
ভেবেছিল দেখে তে ত! এখন মনে হচ্ছে না। বরং আগের 
চেয়ে অনেক দয়ালু, অনেক সহৃদয় 


১১৪ 


সেতুবন্ধ 

‘আইরিন, আর কতদিন এভাবে আমরা পরস্পরকে কষ্ট 
দেব! ওগো, আর কতকাল 

গত কয়েক সপ্তাহের সমস্ত দুঃখ সমস্ত বেদন! যেন হঠাৎ 
একসাথে উথলে ওঠে । আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে আইরিন। 
টলে পড়ে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি স্বামী জড়িয়ে ধরলেন 

“আইরিন !! মমতামাখানে! মধুর স্বরে স্বামী ডাকলেন। 
‘আইরিন! আইরিন!’ 

বারবার তার নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। গলার স্বর 


. কোমল থেকে কোমলতর হয় এল, নিবিড় হয়ে উঠল 


আস্তুরিকতায় | সহানুভুতির ছোয়ায় তিনি সান্তনা দিতে চান 
আইরিনকে--ডভুলিয়ে দিতে চান আইরিনের এই অসহ অন্তর্দাহ। 

তৰু স্বামীর ডাকে সে সাড়! দিতে পারেন৷--ফু পিয়ে ওঠে। 
কেবলি ফোপাতে থাকে। দুঃসহ যন্ত্রণায় ফু পিয়ে ফু পিয়ে 
কাদে _ অবিরাম ফু'পিয়ে চলে। দম্‌আটকানো এই কান্নায় 
বুকটি বুঝি তার চৌচির হয়ে যায়। 

আ্বামী তাকে কোলে করে এনে সোফায় শুইয়ে দিলেন। 
মাথার তলায় বালিশ গুজে দিলেন, কম্বল দিয়ে ভালো! করে 
সারা দেহটি ঢেকে দিলেন। তবু, ফোপানি তার থামে না। 
সেই সাথে শীতার্ডের মত কাপছে তার সর্বশরীর-__যেন 
ঝড় বয়ে চলেছে শিরায় শিরায়। 

স্বামী হাতখানি মুঠো করে ধরে রইলেন, গলায় স্েহচুম্বন 
একে দিলেন, কপোলে চুমো খেলেন। 


১১৫ 


সেতুবন্ধ 

' দুই গাল দিয়ে আইরিনের নেমে আসছে অবিরল অকশ্রুধারা, 
দপদপ করছে রগদ্ুটি। 

এবার স্বামী উৎকষ্টিত হয়ে ওঠেন। 

স্ত্রীর পাশে নতজানু হয়ে বসে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে 
গিয়ে ফিশফিশ করে বললেন, ‘আইরিন, রীনা:-:'আর কেন 
কীদছ সোন! সব এখন চুকবুকে গিয়েছে। আর কাঁদে 
না-ছিঃ! ওগো, আর তোমার কোন ভয় নেই-_আর সে 
কখনো আসবে না--- 

আইরিনের দেহট! আবার থরথরিয়ে উঠল । স্বামী দৃঢ়ভাবে 
তাকে জড়িয়ে ধরলেন। স্ত্রীর এই বুকভাঙা বোবা-কান্নায় 
নিজেও এখন বড় অস্বস্তি বোধ করছেন। নিজেকে তার এখন 
খুনী বলে মনে হচ্ছে। 

আবার আইরিনকে চুমো খেলেন, আবার চুমোয় চুমোয় 
মুখখানি তার ছেয়ে দিলেন। 

না গো না--সে আর কোনওদিনও আসবে ন ৷৷ আবেগ- 
মথিত স্বরে বলতে লাগলেন, ‘আমি কথা দিচ্ছিঁ_আর কক্ষনো 
মে তোমায় জ্ঞালাতন করবেন! । তুমি এত ভয় পেয়ে যাবে, কি 
করে বুঝব, ব( : আমি শুধু তোমার কর্তব্যের কথাট! মনে 
করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম আইরিন, স্ত্রী হিশেবে খোকাখুকুর ম! 
হিশেবে তোমার যে পবিত্র দায়িত্ব রয়েছে.--তোমায় শুধু 
আমি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম তোমার আপন সংসারে, 
তোমার আপনজনদের মাঝখানে তোমায় শুধু আমি ফিরিয়ে 


১১৬ 


সেতুবন্ধ 
আনতে চেয়েছিলাম্‌--:ওর কাছ থেকে সরিয়ে. সব কথা 
যখন আমার কানে এল, তুমিই বলো, এছাড়া আর কী আমি 
করতে পারতাম? মুখ ফুটে তোমায় কিছু বলতে পারিনে, 
আবার চোখ বুজে থাকাও অস্ভব। কতবার ভেবেছি--নিজের 
ভুল তুমি নিজেই একদিন বুঝবে, আশ! করেছি_ নিজে 
থেকেই ফিরে আসবে হায়রে! নিজে থেকে ভুল তুমি বুঝলে 
না, নিজে থেকে ফিরে তুমি এলে না! তাই ন! বাধ্য হয়ে এই 
পথ আমায় বেছে নিতে হল। ভয় দেখিয়ে তোমায় ফিরিয়ে 
আনবার জন্যে ওই স্্রীলোকটিকে:*“ও-ও বড় দুঃখী, আইরিন! 
ও-ও বড় অভাগিনী ! আগে অভিনেত্রী ছিল':-এখন পেট 
পুরে খেতেও পায় না৷"! কিন্তু এখন দেখছি, জোর করা 
আমার অন্তায় হয়ে গেছে।-*-বিশ্বাস করো, ইচ্ছে করে তোমায় 
ব্যথা দিতে আমি চাইনি। আমি শুধু তোমার ভুলটুকু 
বুঝিয়ে দিতে, তোমায় ফিরিয়ে আনতে'*আভাসে-ইঙ্গিতে 
বারবার কি সেটা তোমায় জানাইনি ? ঘুরিয়ে কতবার তে 
বলেছি_সব আমি ভুলে যেতে রাজি, ওগো, তুমি শুধু ফিরে 
এসো । তরু আমার মনের কথা তুমি বুঝতে পারলে ন!। 
বিশ্বাস করো--*শেষ পর্যন্ত তুমি যে ওই চরম পথ বেছে নেবে, 
কল্পনাও করিনি। বিশ্বাস করো**এ আমি ভুলেও চাইনি। গত 
ক’দিন আমিই কি কম কষ্ট পেয়েছি! দিনের পর দিন:-'না, 
নিজের কথ! ভাবিনে_ শুধু ওদের':আমাদের খোকাখুকুর 
সুখের দিকে তাকিয়ে, ওদের ভবিষ্যত ভেবেই তোমায় 


১১৭ 


সেতুবন্ধ 


আমি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম : যাক---এখন সব শেষ হয়ে 
গিয়েছে। আবার সব আগের মত_ 

অনেক দূর থেকে-_অসীম শৃন্ত থেকে__যেন ভেসে 
আসছে স্বামীর কথাগুলি_ভালো করে আইরিন সব শুনতেও 
পাচ্ছেনা । মনে তার শুরু হয়ে গেছে ঝড়ের মাতন, কোনরকম 
অন্ভুভুতি তার নেই আর । আবছ! আবছ| মনে হয়-__একজন 
তাকে আদর করছে, সোহাগ জানাচ্ছে, তার চোখের জলে 
গাল দুটি তার ভেসে যাচ্ছে। 

আর, হৃদয়ের কোন্‌ গভীর গহন থেকে উঠে আসছে এক 
রহস্যময় মর্মরধ্বনি। 

এরপরের কথা কিছু তার মনে পড়ে না। গুধু বারেকের 
জন্যে মনে হয়, কে যেন তার পোশাক-আষাক আস্তে আস্তে 
খুলে নিচ্ছে। চোখ মেলে তাকায়-_-স্বামী ঝুঁকে পড়েছেন_ 
কী ব্যাকুলতা, তার চোখে মুখে ! , 

তারপর, আবার নেমে আসে অন্ধকারের নিকষকালে! 
যবনিকা। ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় সমস্ত চেতনা_ 
সৰ্বসন্তাপহারিণী নিদ্রার কোলে নিজেকে আইরিন নিঃশেষে 
সপে দেয়। 


আইরিনের যখন ঘুম ভাঙল, বেশ বেল! হয়ে গিয়েছে। 
জানাল! দিয়ে নতুন দিনের আলো আসছে, তার মনেও 


১১৮ 


সেতুবন্ধ 

জ্বলে উঠেছে একটি আলোর প্রদীপ_প্রশান্তির শিখা_বড়- 
শেষের প্রশান্তি ৷ 

অতীতের কথা আইরিন মনে করতে চায়-_কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন 
মনের আকাশ । 

সব যেন স্বপ্ন ! স্বপ্নের পাখায় ভর দিয়ে দিয়ে নিরবয়ব তাঁর 
দেহটি যেন ভেসে চলেছিল উধাও শূন্যে, মাটির পৃথিবীতে পা 
দেওয়ার মত সাথে সাথে ভেঙে গিয়েছে সেই স্বপ্ঘোর। 

একি? এই তে| সেই আংটি !.-- 

এবার আইরিন পুরোপুরি সচেতন হয়ে ওঠে । যে কথাগুলি 
সে শুনেও শোনেনি, মানে যার বুঝেও বোঝেনি-_চকিতে 
সেসব এখন স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায়। বিদ্যুত ঝলকের মত 
মনে পড়ে সমস্ত ঘটনাটি! ? স্বামীর সেই অনল প্রশ্ন! আর, 
প্রেমিকার সেই অপার বিস্ময়! কেটে যায় কুয়াশার মেঘ, 
সবকিছু এখন জলের মত স্বচ্ছ_সে ধরা পড়ে গিয়েছে_সব 
জানাজানি হয়ে গেছে। 

স-ব! 

লজ্জায়, গ্রীনিতে আইরিন অভিভূত হয়ে পড়ে, দেহ মন তার 
রী রী করে ওঠে দ্বণায়। কেন--কেন তার ঘুম ভাঙল ! কেন 
সে ফের জেগে উঠল! 

হঠাৎ, না্স/রী থেকে ভেসে এল খোকাখুকুর কণ্ঠস্বর। 
‘এইমাত্র ঘুম ভাঙল ভাই বোনের! কলম্বরে কথা কইছে। 
পাখির কাকলি যেন। 


১১৯ 


সেতুবন্ধ 

নতুন প্রভাতকে অভিবাদন জানাচ্ছে ভোরের পাখিরা যেন! 

ওই তো রুডির গল| । হুবহু স্বামীর কণ্ঠস্বর! আশ্চর্য! 
বাপের সাথে ছেলের কণ্ঠস্বরে এত মিল-_অথচ কোনদিন 
এট! কিন৷ তার খেয়াল হয়নি ! আশ্চর্য! 

মৃতু হাসিতে আইরিনের ঠোঁটি দুটি ঈষৎ শ্ফুরিত হয়ে 
ওঠে। আবেশে চোখ বুজে আসে, চোখ বুজে সে উপভোগ 
করতে চায় মনোরম এই পরিবেশ্টুকু_যার জন্যে বীচ! তার 
সার্থক হয়েছে, যার জন্যে খুশিতে হৃদয় এখন কানায় কানায় 
ভরে গিয়েছে। 

এখনে একট! ব্যথ| খচখচ করছে অন্তরের অন্তস্থলে_ 
করুক, এ-ক্ষত নিতাস্তই ক্ষণস্থায়ী । ধীরে ধীরে এট! নিরাময় 
হয়ে যাবে_আইরিন জানে-_দুদিনেই সে একেবারে সুস্থ হয়ে 
উঠবে।